মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এক ভয়াবহ ও বিস্তৃত রূপ ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি বাহিনীগুলোকে সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালানোর জন্য উৎসাহিত করেছেন।
ট্রাম্প রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কুর্দিরা যদি এই যুদ্ধে অংশ নিতে চায় তবে তিনি একে স্বাগত জানাবেন। কুর্দি মিলিশিয়ারা ইতিমধ্যে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সম্ভাব্য আক্রমণের কৌশল নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে গত সপ্তাহে বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি জোরালো ভূমিকা থাকতে হবে।
যুদ্ধের সপ্তম দিনে ইসরায়েল শুক্রবার তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক আকারে বিমান হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি কাতারের আল উদিদসহ ইরাক ও কুয়েতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের রামাট ডেভিড বিমান ঘাঁটি এবং রাডার সাইটগুলোকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে এই লড়াইকে ইরানের জন্য একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন যে, যেখান থেকেই মার্কিন আক্রমণ আসবে সেখানেই তারা পালটা আঘাত হানবেন।
আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন আজারবাইজানেও ছড়িয়ে পড়েছে। চারটি ইরানি ড্রোন আজারবাইজানের সীমান্ত অতিক্রম করে নাখচিভান ছিটমহলে আঘাত হানলে চারজন আহত হন। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ একে ‘বিনা উসকানিতে সন্ত্রাস ও আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এর পাশাপাশি লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরায়েলের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার চরমপত্র দিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুদ এবং ইচ্ছাশক্তি অটুট রয়েছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং নৌবাহিনী ধ্বংসের কাজ চলছে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩০টি ইরানি জাহাজ এবং একটি বড় ড্রোন ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর তদন্ত করছে পেন্টাগন। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং শেয়ার বাজারের দরপতনে মার্কিন জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, যদিও ট্রাম্প সেই উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭৫ জন স্কুলছাত্রী ও শিক্ষক রয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৭৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। দক্ষিণ বৈরুত থেকে হাজার হাজার মানুষ ইসরায়েলি সতর্কবার্তার পর ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন।
একদিকে মার্কিন প্রশাসন বলছে তারা কেবল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায়, অন্যদিকে ট্রাম্পের সরকার পরিবর্তনের ডাক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্তমানে বিশ্বের তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক লজিস্টিক এবং বিমান পরিবহন খাত এক চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
