ডেঙ্গু, আতঙ্ক এবং কলহ

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ২১:১৮

বিভুরঞ্জন সরকার

দেশে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ডেঙ্গু। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ। এর মধ্যেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কমপক্ষে ২০ জন মারা গেছেন। হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ২৩ হাজার ছাড়িয়েছে। ঢাকায় শুরু হলেও এখন ডেঙ্গু সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ। ডেঙ্গু এখন এক মহা আতঙ্কের নাম। ঘরে ঘরে ভয়, শঙ্কা। আগামী আরো দেড়-দুই মাস ডেঙ্গুর আতঙ্ক থাকবে। এমনকি পরিস্থিতির আরো অবনতিও হতে পারে বলে কীটতত্ত্ব, রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যর্থ হয়েছে। আগাম সতর্কতা থাকলেও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের যথাসময়ে টনক নড়েনি। ঢাকার দুই মেয়রের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে এখন পরিস্থিতি আর সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

ডেঙ্গুর আক্রমণ এবার প্রথম হলো তা নয়। ২০০০ সাল থেকেই আমাদের দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। গত দু-তিন বছর ধরে এর প্রকোপ বেড়েছে। মূলত এডিস মশার কামড়ালেই ডেঙ্গু হয়। তাই ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে হলে এডিস মশা নিধনের কোনো বিকল্প নেই। এডিস সম্ভ্রান্ত মশা। এর প্রজননক্ষেত্র ডোবা-নালা-আবর্জনার স্তূপে নয়। এরা বাসাবাড়িতে স্বচ্ছ পানিতে, ফুলের টবে বা এ ধরনের বাহ্যত পরিচ্ছন্ন পানিতেই বংশবিস্তার করে। সাধারণ কিউলেক্স মশা এবং অসাধারণ এডিস মশার পার্থক্য সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এমনকি আমাদের দুই সিটি করপোরেশনেও নাকি কিউলেক্স ও এডিস মশার পার্থক্য বোঝার মতো লোক নেই। সেজন্যই মশা নিধনের কোনো কর্মপরিকল্পনাও সিটি করপোরেশনের নেই।

সাধারণ কিউলেক্স মশা নিধনের জন্য কিছু ওষুধ ছিটানো হয়। যে কোনো কীটনাশক দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে তার কার্যকারিতা কমে যায়। সহনশীল হয়ে যায়। মশা নিধনের জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হয় তা অকার্যকর বলে সিটি মেয়র জানিয়েছেন। এটা তো সাধারণ মশার ব্যাপার। এডিস মশা নিধনের জন্য কী ওষুধ ব্যবহার করা দরকার সে তথ্যই সম্ভবত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা নেই। কীটনাশক কেনার আগে যে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন, এটাও হয়তো মানা হয় না।

এ বছর যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আগাম হুঁশিয়ারি ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। কানে পানি না ঢুকলে তাদের হুঁশ হয় না। তাই তারা এডিস মশা নিধনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নাগরিকদের সতর্ক করেনি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। তবে জনগণকে সচেতন করা, এডিস মশার জন্ম কোথায় হয়, সে সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা চালানো অবশ্যই সিটি করপোরেশনের কাজ। এই কাজটি করতে সিটি করপোরেশন সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি থাকা উচিত ছিল। কারণ ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিত্সাসেবা-সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও ছিল চরম উদাসীনভাব। ডেঙ্গু যখন ছড়িয়ে পড়েছে, মানুষ যখন মারা যাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফরের ঘটনা সবাইকে ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আগেভাগে দেশে ফিরলেও এ নিয়ে সমালোচনা শিগগিরই বন্ধ হবে না। ডেঙ্গু যে কত বড়ো বিপদ হয়ে আসছে—সেটা মন্ত্রী, মেয়র কেউ বুঝতে পারেননি। তাই এ নিয়ে তারা হাস্যকর বক্তব্য দিয়ে মানুষের মনে বিরূপতা বাড়িয়েছেন।

ডেঙ্গু শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়। অনেক উন্নত দেশও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। সিঙ্গাপুরেও এ বছর ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়ে নাগরিকদের মন থেকে উদ্বেগ দূর করেছে। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের কলকাতা শহরকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের এখানেও ডেঙ্গু দমনে আমরা কলকাতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। আগেই বলা হয়েছে, এডিসের জন্ম যেখানে-সেখানে নয়, মোটামুটি অভিজাত পরিবেশে। এডিস মশা বেশি ওপরে উড়তে পারে না, বেশি দূরও যেতে পারে না। এডিসের আয়ুষ্কাল মাত্র ২১ দিনের। এই সময়ের মধ্যে সে চার-পাঁচ বার রক্ত খায়! অর্থাত্ একটি এডিস মশা চার-পাঁচ জনের ডেঙ্গুর কারণ হতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ে একদিকে যেমন বাণিজ্য হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি রাজনীতিও হচ্ছে। এগুলো অমানবিক। কীটনাশক থেকে শুরু করে মশা মারার যত উপকরণ আছে তার সবগুলোর দাম বেড়ে গেছে। মানুষের দুঃখকষ্টকে পুঁজি করে বাণিজ্য করা আমাদের দেশে একটি নিয়মিত ঘটনা। আবার যে কোনো ‘ক্রাইসিস’ নিয়ে রাজনীতি করাও আমাদের দেশি চল। সরকারকে দোষী বা ব্যর্থ প্রমাণ করতে পারলে বিরোধীরা আমোদিত হয়। বিএনপি বলছে, সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যর্থ। কথা অসত্য নয়। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিএনপির ভূমিকা কী? ডেঙ্গু তো বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেও বহাল তবিয়তে ছিল। বিএনপি কি ডেঙ্গু নির্মূল করতে পেরেছিল?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, ২০০০ সালে ডেঙ্গু ছড়ালে ড. ইউকিনোর নেতৃত্বে জাইকা অবিভক্ত সিটি করপোরেশনে একটি প্রকল্প নিয়েছিল। তিনি কীটতত্ত্বের ছাত্র থাকতেই ঐ প্রকল্পে চাকরি পান। প্রকল্পটি অনেক সুফল দিয়েছিল। অথচ সাদেক হোসেন খোকা মেয়র হয়ে এসে প্রথমে তাদের ১৪ জনের বেতন বন্ধ করেন। এরপর প্রকল্পটিই বন্ধ করেন। দুঃখজনকভাবে সেদিন রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছিল।

বিএনপির এখন যখন সরকারের ব্যর্থতার কথা বলে তখন শুধু বলতে ইচ্ছা হয় : ‘কার নিন্দা করো তুমি, মাথা করো নত। এ আমার এ তোমার পাপ’ !

বিএনপি আমলে যে কোনো কারণেই হোক ডেঙ্গু নিয়ে ‘আওয়াজ’ কম উঠেছে, এখন আওয়াজ বেশি হচ্ছে। আচ্ছা, এবার হঠাত্ ডেঙ্গু নিয়ে এত বেশি আওয়াজ উঠছে কেন? এর পেছনে কি কোনো রাজনীতি আছে?

আমাদের দেশের রাজনীতি যেমন রাজধানীকেন্দ্রিক, রাজধানী থেকে তারপর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, ডেঙ্গুও তেমনি এতদিন ছিল রাজধানীকেন্দ্রিক, এবার ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। রাজধানী থেকে শুরু হওয়ায় এবং অবস্থাপন্ন পরিবারের মানুষ মারা যাচ্ছে বলেই এবার ডেঙ্গু নিয়ে হইচই বেশি বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে নগরবাসীকেই। নিজের ঘরবাড়ি নিজেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সবকিছুর দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে বসে থাকলে নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ আর থাকবে না। সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট, ডোবানালা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব পালন করতে পারে কিন্তু আমার ঘরের ভেতর, ফ্রিজ, এসি, কার্নিশ, বারান্দার টব—এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হবে। আমি এডিসের জন্ম দেব আর ডেঙ্গুর দায় চাপাব অন্যের ঘাড়ে এটা হয় না, এটা ন্যায্য অবস্থান নয়। ডেঙ্গুতে যদি রাজধানীর বাইরের হতদরিদ্র মানুষজন মৃত্যুবরণ করতেন, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ে চিত্কার কম শোনা যেত বলে আমার ধারণা। এবার ডেঙ্গুতে বিত্তবানেরাই বেশি মারা যাচ্ছেন, তাই ডেঙ্গু নিয়ে এত কলরব।

ডেঙ্গু নিয়ে দেশ এক প্রকার দুর্যোগের মধ্যে পড়েছে। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন হয় জাতীয় ঐক্যের। কিন্তু আমরা কলহ ও দলাদলিপ্রিয় জাতি। বিভেদ নিয়েই আমাদের বসবাস। ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা পূরণ হবার নয়।

n লেখক : সাংবাদিক