রফিকুল ইসলাম রবি
ঢাকা শিশু হাসপাতালে শুয়ে আছে শিশু সনিয়া। এক হাতে স্যালাইন লাগানো। চোখ দুটো টকটকে লাল আর মুখটা ফ্যাকাসে। পাশে বসা তার মা আকলিমা একটু পরপর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। সনিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার মায়ের দিকে। আকলিমা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। পেশায় একজন গৃহকর্মী। থাকেন কল্যাণপুর বস্তিতে। জানতে চাইলে বলেন, চার দিন ধরে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। মেয়ের গায় জ্বর ওঠার পর ভেবেছিলেন, সেরে যাবে। একপর্যায়ে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের লোকজন বলল, হাসপাতালে নিয়া যেতে। এখানে এসে টেস্ট করার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ছে।’ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বাসাবাড়িতে কাজ করে পেট চালাতে হয়। আশপাশের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা ধার করে নিয়ে এসেছি। তাও শেষ হয়ে গেছে। চার দিন ধরে কাজে যেতে পারছি না। এদিকে মেয়ের অবস্থাও ভালো না। জন্মের পর ওর বাবা ফেলে চলে যায়। এরপর মেয়েটাকে ঘিরেই আমার সংসার। এখন মেয়েটার কিছু হলে, আমার বাঁচা-মরা সমান কথা।’
একই হাসপাতালের বারান্দার এক কোণে দুই বছরের কন্যাশিশু কোলে নিয়ে বসে ছিলেন শাহানা বেগম। এসেছেন কড়াইল বস্তি থেকে। জ্বর না কমায় মেয়েটিকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষায় ধরা পড়ে মেয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত। স্বামী রিকশাচালক। স্ত্রী-কন্যাকে হাসপাতালে রেখে রিকশা নিয়ে রোজগারে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে তাকে। কারণ হিসেবে শাহানা বললেন, মেয়ের চিকিত্সার জন্য প্রতিদিন ১ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। হাতে নেই একটা টাকাও। টাকার জন্যই ওর বাবা রিকশা চালাতে গেছে।
পাশেই বসা আসমা আক্তার। গাবতলী থেকে চার বছর বয়সের ছেলে তামিমকে নিয়ে এসেছেন। বেড না পেয়ে জায়গা হয়েছে হাসপাতালের বারান্দায়। জানতে চাইলে বলেন, ‘তিন দিন ছেলের গায় জ্বর ছিল। সবাই কইছে ডেঙ্গু বড়োলোকের রোগ, তাই গুরুত্ব দেইনি। হাসপাতালে আনার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। এহন তো দেখতাছি ধনী-গরিব সবাইরেই ধরতাছে।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রবিবার রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৫ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। রবিবার ডেঙ্গু টেস্ট করানো হয়েছে ১৯০ জনকে। যার মধ্যে ১১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এ বছর মোট ৫৬৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সা নিয়েছে ঢাকা শিশু হাসপাতালে। ডেঙ্গুর সন্দেহজনক তালিকায় আছে আরো ২১১ জন।
শিশু হাসপাতাল থেকে একটু দূরেই শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালের বাইরে বারান্দায়ও স্থান হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের। মশারি টানানো রোগীদের হাতে স্যালাইন লাগানো। কারো কারো বিছানার পাশেই জ্বলছে মশার কয়েল।
হাসপাতালের বারান্দার সঙ্গে যুক্ত আরেক অংশের করিডোরে শুয়ে আছেন ৫০ ঊর্ধ্ব আব্দুল মালেক। রাজধানীর সেনপাড়ার একটি বাড়িতে দারোয়ানের চাকরি করেন। এ চাকরিতেই চলে তার ছয় জনের সংসার। জ্বর নিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে শুয়ে আছেন হাসপাতালে। ভেতরে জায়গা না পেয়ে আরো অনেকের মতোই ঠাঁই হয়েছে করিডোরে। তার শরীরেও ধরা পড়েছে ডেঙ্গু ভাইরাস। আব্দুল মালেক বলেন, ‘আল্লাহ্ জানে, এখান থেকে ফিরে যেতে পারবো কি না। এ মুহূর্তে আমার কিছু হলে পুরো সংসারটা পথে বসতে হবে।’
পাশেই শুয়ে আছে রাসেল হাওলাদার। পেশায় একজন বাস চালক। থাকেন মিরপুর বেড়িবাঁধে। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে পাঁচ জনের সংসার তার। পাশে বসে থাকা এক নারী জানালেন, ‘ডেঙ্গু বাজাইছে। তিনদিন ধরে এখানে আছি। কাজ-কর্ম সব বন্ধ। দিনে অন্তত দেড় হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সবই চলছে ধার কর্জের ওপর।’ একই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সার জন্য আসা দিনমজুরে আরিফ হোসেন বলেন, আগে তো হুনছি এইডা নাক্কি খালি বড়োলোকগোই অইয়া থাকে। কিন্তু এহনত দেখছি আমগো মতন গরিবগোরেও ধরছে, বড়োলোকগো নাইলে পয়সা আছে; কিন্তু আমগো মতো গরিবের মরণ ছাড়া গতি নাই।
রাজধানীর সরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিনই হাসপাতালে আসছে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ। আক্রান্তদের মধ্যে বেশির ভাগই নিম্নআয়ের মানুষ। হাসপাতালে অনেকে আট-দশদিন ধরেও ভর্তি আছেন। বেড সংকটে হাসপাতালের বারান্দা, করিডোরে স্থান হয়েছে রোগীদের। নিম্নআয়ের এসব মানুষ ডেঙ্গু চিকিত্সায় দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
রোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বেশির ভাগ পরীক্ষাই করিয়ে আনতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে থেকে। কোনো কোনো রোগীর ডেঙ্গুর সঙ্গে দেখা দিয়েছে টাইফয়েডসহ অন্যান্য জটিলতা। ফলে তাদের চিকিত্সা ব্যয়ও বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালে সরকারি কিছু ওষুধ এবং বিনামূল্যে সিট ভাড়া সুবিধার সঙ্গে নিজেদের পকেট থেকে ডেঙ্গু চিকিত্সায় চলে যাচ্ছে দিনে এক-দেড় হাজার টাকা।
