‘যন্ত্র-নির্দেশিত’ যুগ: আমরা কতটা প্রস্তুত?

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৭:২০

মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার রহিয়াছে, যাহা মানুষের জীবনযাত্রাকে একেবারে আমূল পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। আগুনের আবিষ্কার অন্ধকারে আলো জ্বালাইয়া খাদ্য রন্ধন, সুরক্ষা ও প্রযুক্তির আদিম ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিল। চাকার আবিষ্কার মানুষের চলাচল ও বাণিজ্যের গতি বহু গুণ বৃদ্ধি করিয়া বিশ্বায়নের প্রথম বীজ বপন করিয়াছিল। শিল্প-বিপ্লব যন্ত্রশক্তিকে কাজে লাগাইয়া উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করিয়াছিল। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতায় বর্তমান যুগে আর একটি যুগান্তকারী শক্তি সুস্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা ইতিমধ্যে একবাক্যে বলিতেছেন-মানবসভ্যতা এখন এক বিরাট সন্ধিক্ষণে উপস্থিত। একদিকে সেই যুগ, যাহাতে মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, শ্রম ও বিচক্ষণতাই ছিল সভ্যতার প্রধান চালিকাশক্তি। অপরদিকে এমন এক যুগের সূচনা ঘটিতেছে, যাহাতে যন্ত্র কেবল মানুষের সহায়ক নহে, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও সক্রিয় অংশীদার হইয়া উঠিতেছে। ভবিষ্যতের কোনো ইতিহাসকার হয়তো মানবসভ্যতার এই পরিবর্তনকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া দেখাইবেন- মানুষের একক মেধার যুগ এবং মানুষের নির্মিত বুদ্ধিমত্তার যুগ।

এই নূতন প্রযুক্তির সম্ভাবনা ইতিমধ্যে বহুমাত্রিকভাবে প্রতিভাত হইতে আরম্ভ করিয়াছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোগ নির্ণয়ের বহু ক্ষেত্রে মানুষের চক্ষুর চাইতেও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করিতে সক্ষম হইতেছে। উন্নত হাসপাতালসমূহে শল্যচিকিৎসার পূর্বে রোগীর অঙ্গসংস্থানের জটিল মানচিত্র বিশ্লেষণ করিয়া যন্ত্রই চিকিৎসককে সহায়তা করিতেছে। কৃষিক্ষেত্রে মাটির গুণাগুণ, আর্দ্রতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও উৎপাদনের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করিয়া বুদ্ধিমান প্রযুক্তি কৃষকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করিতেছে। বিচারব্যবস্থায় লক্ষ লক্ষ পূর্ববর্তী মামলার নজির বিশ্লেষণ করিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্তি ও তথ্যের দ্রুত বিন্যাস করিতে পারিতেছে। অর্থনীতির জগতে বাজারের অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও প্রবণতা বিশ্লেষণেও অ্যালগরিদমিক প্রযুক্তি ক্রমশ অধিক কার্যকর হইয়া উঠিতেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও পরিবর্তনের এই স্রোত দ্রুত প্রবাহিত হইতেছে। আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ব বলিতেছে-প্রতিটি শিক্ষার্থীর বুদ্ধিপ্রবণতা ও শেখার গতি এক নহে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ব্যক্তিগত বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করিয়া শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক পাঠক্রম নির্ধারণ করিবার ক্ষমতা রাখে। ফলে ভবিষ্যতের বিদ্যালয় হয়তো একক পাঠ্যপুস্তকের উপর নির্ভরশীল থাকিবে না; বরং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার নতুন মডেল প্রতিষ্ঠিত হইবে। এই বাস্তবতা একটি গভীর সত্যের দিকেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে-মানবসভ্যতা ক্রমশ 'যন্ত্র-সহায়ক' যুগ হইতে ‘যন্ত্র-নির্দেশিত’ যুগের দিকে অগ্রসর হইতেছে। দূরদর্শী রাষ্ট্রসমূহ ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় শিক্ষানীতির কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করিতে আরম্ভ করিয়াছে। সিংগাপুর প্রাথমিক শিক্ষা হইতে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রযুক্তি ও এ-আই শিক্ষাকে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করিয়াছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিদ্যালয় পর্যায়েই কোডিং, ডেটা বিশ্লেষণ ও যান্ত্রিক শিক্ষার ভিত্তি গড়িয়া তুলিবার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। ইউরোপের বহু দেশে নাগরিকদের প্রযুক্তি-সচেতন করিবার জন্য উন্মুক্ত এ-আই পাঠক্রম চালু হইয়াছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তো আরও এক ধাপ অগ্রসর হইয়া রাষ্ট্রপরিচালনা ও প্রশাসনিক কাঠামোতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কৌশলগতভাবে সংযোজন করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। এমনটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হইতেছে বলিয়া গুঞ্জন শোনা যায়।

ইহা স্পষ্ট যে, যাহারা আজ প্রযুক্তির এই নূতন অধ্যায়কে গ্রহণ করিতেছে, তাহারাই আগামীর জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে নেতৃত্ব দিবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের নিজেদের দিকে দৃষ্টি ফিরানো অত্যাবশ্যক। আমরা কি এই পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকে সামনে রাখিয়া নির্মিত হইতেছে? যদি না হয়, তাহা হইলে এখনই প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার। প্রাথমিক স্তরে প্রযুক্তি-সাক্ষরতা, মাধ্যমিকে ডেটা-চিন্তা ও অ্যালগরিদমিক যুক্তির ধারণা, উচ্চশিক্ষায় মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষকসমাজকে আধুনিক প্রযুক্তি-জ্ঞান দিয়া প্রস্তুত করাও অপরিহার্য।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নূতন অধ্যায় ইতিমধ্যেই সূচিত হইয়া গিয়াছে। প্রশ্ন এখন আর এই নহে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সমাজকে পরিবর্তন করিবে কি না। প্রশ্ন হইল-এই পরিবর্তনের ইতিহাস আমরা নিজেরা লিখিব, নাকি অন্যের লিখিত ইতিহাস কেবল পাঠ করিয়াই সন্তুষ্ট থাকিব?

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন