প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের জীবনে অভাবনীয় বিপ্লব সাধন করিয়াছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ক্লাউড কম্পিউটিং, জেনেটিক ডেটাবেস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-আমাদের জীবনকে সহজ করিয়া দিয়াছে; কিন্তু ইহার বিনিময়ে আমরা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস হারাইতে বসিয়াছি। তাহা হইল আমাদের প্রাইভেসি তথা গোপনীয়তা। জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের এই যুগে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য কি আর ব্যক্তিগত থাকিতেছে? আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়াইয়া আছি, যেইখানে প্রযুক্তির বিকাশ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আমাদের গোপনীয়তা কাড়িয়া লইতেছে। বর্তমানে প্রযুক্তি যেইভাবে অগ্রসর হইতেছে, ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত তথ্য বলিয়া আদৌ কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকিবে কি না সন্দেহ।
ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের প্রযুক্তি বর্তমানে এতটাই উন্নত হইয়াছে যে, আমরা কখন কোথায় যাইতেছি, কী করিতেছি, কী ভাবিতেছি-সকল কিছুই কোনো না কোনোভাবে নজরদারির আওতায় চলিয়া আসিয়াছে। এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচাইতে প্রয়োজনীয় জিনিস স্মার্টফোনের কথাই ধরা যাউক। আমরা হয়তো খেয়াল করি না: কিন্তু আমাদের প্রতিটি কল, মেসেজ, লোকেশন, এমনকি আমাদের ভয়েস কমান্ডও সংরক্ষিত হয়। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি ব্যবহারকারীদের নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ করিয়া লক্ষ লক্ষ ডলারের বিজ্ঞাপন বাজার তৈরি করে।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গুগল প্রতিদিন গড়ে একজন ব্যবহারকারীর ৫০টি আলাদা তথ্য সংগ্রহ করে, যাহার মধ্যে রহিয়াছে তাহাদের লোকেশন, অনলাইন সার্চ হিস্টরি, কেনাকাটার অভ্যাস, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সকল কার্যক্রম। কেবল করপোরেট প্রতিষ্ঠান নহে, সরকারও নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করিতে পারে। চীনের 'সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম' ইহার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রম বিশ্লেষণ করিয়া তাহাদের সামাজিক রেটিং দেওয়া হয়, যাহা তাহাদের চাকুরি, ভ্রমণ, এমনকি ব্যক্তিগত জীবন মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো আমাদের দেশেও বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন সাপেক্ষে সরকার আমাদের অনলাইন কার্যক্রম মনিটরিং করিয়া থাকে। এখনই তো অফিসে যাওয়ার পথে আমাদের গাড়ির জিপিএস আপনার গতি ও লোকেশন বিশ্লেষণ করিয়া জানিতে পারা যায়-আমরা কোথায় যাইতেছি, কতক্ষণ থাকিতেছি।
আমরা যদি এই গতিতে আগাইতে থাকি, তাহা হইলে আগামী ২০ থেকে ৩০ বৎসর পর আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছুই থাকিবে না। হয়তো তখন আমাদের জীবন হইবে একধরনের 'ওপেন বুক', যেইখানে আমাদের প্রতিটি কাজ নজরদারির আওতায় থাকিবে। এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যাউক। ধরুন আপনি ঘুম থেকে উঠিয়া কফি বানাইতেছেন, আপনার স্মার্টকিচেন জানাইয়া দিবে আপনি কোন ব্রান্ডের কফি খান এবং সেই তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের নিকট বিক্রি হইবে। আপনার স্মার্টফ্রিজ বলিয়া দিবে আপনি ও আপনার পরিবার কী কী খাবার খান। এমনকি আপনার স্মার্টকোমড মেডিক্যাল ফিল্ডকে বলিয়া দিবে আপনি এখন কোন কোন শারীরিক সমস্যার মধ্যে রহিয়াছেন। এমনকি আমাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম বিশ্লেষণ করিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আমাদের চিন্তাভাবনার পূর্বাভাস করাও সম্ভব হইবে।
এই বাস্তবতায় কি আমরা স্বস্তিতে থাকিতে পারিব? আমাদের উপর যে সর্বক্ষণ নজর রাখা হইতেছে-ইহা জানিয়া আমরা কি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করিতে পারিব? দার্শনিক মিশেল ফুকো তাহার 'প্যানোপটিকন' তত্ত্বে বলিয়াছেন, যদি মানুষ জানে যে, সে সর্বদা পর্যবেক্ষণের আওতায় রহিয়াছে, তখন সে স্বেচ্ছায় নিজের আচরণ পরিবর্তন করে। আমরা কি ভবিষ্যতে আমাদের দৈনন্দিন আচরণ পরিবর্তন করিতে পারিব? যদি করিও, তখন আমাদের আচরণ কিংবা চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটিবে না-সেটিও জোর দিয়া বলা যায় না। ইহা সত্য যে, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামাইবার কোনো উপায় নেই। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কি ভবিষ্যতে গোপনীয়তা ছাড়াই বাঁচিতে অভ্যস্ত হইয়া যাইব? নাকি প্রযুক্তির সহিত ভারসাম্য রাখিয়া আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে রক্ষা করা সম্ভব হইবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল সময়ই বলিতে পারে।

