অণুগল্প

পাগলা শামসু

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ১৮:০০

 

আমাদের ক্লাসে শামসু দুজন। একজন ছোটখাটো এবং শান্ত স্বভাবের। অপর জন অনেক লম্বা এবং দুষ্টু। সে সব সময় অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে সবাইকে হাসাবার চেষ্টা করে। জোরে জোরে কথা বলে। চুল আঁচড়ায় না। শার্টের বোতাম খোলা রাখে। বয়সে আমাদের চেয়ে বড়। সবাই তাকে ‘পাগলা শামসু’ বলে। সে আমাদের স্কুলের বড় হুজুরের (আরবি শিক্ষক) ছেলে।

পাগলা শামসু লেখাপড়ায় ভালো না হলেও খেলাধুলায় ভালো ছিল। প্রতিবছর আন্তঃজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দু-তিনটি বিষয়ে প্রথম স্থান দখল করত। এতে স্কুলের সুনাম বাড়ত। একদিন পাগলা শামসু স্কুলের মাঠে একটি কুকুরকে ধরে লেজে খড়কুটা বেঁধে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। লেজে আগুন নিয়ে কুকুরটি সারা মাঠ দৌড়েছিল। শামসু নিজেই সে আগুন নিভিয়েছিল ফুলবাগানের পানির পাইপ দিয়ে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় স্বাধীনতার দাবিতে সমস্ত দেশ যখন টালমাটাল, পাগলা শামসু তখন মিছিলের পুরোভাগে থাকত। ‘জয় বাংলা’ বলে জোরে জোরে স্লোগান দিত। একদিন মিছিলে পুলিশ লাঠি চার্জ করলে পাগলা শামসু পুলিশের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে পুলিশের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে সে সবার কাছে হিরো হয়ে যায়।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে। সমস্ত এলাকা মানুষ এবং গবাদিপশুর লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পাগলা শামসু দিন-রাত মানুষ ও গবাদিপশুর লাশের সত্কার করতে করতে এক সময় নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সৈন্যরা গণহত্যা শুরু করলে পাগলা শামসু মাইজদীতে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে। পুলিশ ও আনসারদের সঙ্গে সেও স্কুলের ছাত্রদের ট্রেনিং দিতে থাকে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আমরা শুনেছি, জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান আর্মি ও রাজাকারদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অনেক শত্রু মেরেছে সে।

পাগলা শামসুর আব্বা, আমাদের বড় হুজুর বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা মুসলমান। তারা কখনো এ দেশের মুসলমান ভাইদের হত্যা করতে পারে না। তাঁর ছেলে যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা, সুতরাং তাঁর বিপদ হতে পারে। প্রতিবেশীরা তাঁকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু তিনি বাড়ি ছাড়েননি।

একদিন কয়েকজন রাজাকার এবং পাকিস্তানি সৈন্য পাগলা শামসুদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। হুজুর তখন আসরের নামাজের জন্য অজু করছিলেন। একজন সৈন্য বড় হুজুরের কোমরে বুট দিয়ে লাথি মারে। হুজুর ‘আল্লাগো’ বলে কাত হয়ে পড়ে গেলেন। সৈন্যটি হুজুরের চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করল, বল, তোর ছেলে কোথায়?

হুজুর বললেন, সে আমাকে বলে যায় নাই।

লাথি-থাপ্পড় খেয়ে হুজুর কেমন যেন হয়ে গেলেন। ব্যথার চেয়ে তাঁর চোখে বিস্ময়, মুসলমান মুসলমানকে মারে!

একটা নারিকেল গাছের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে সৈন্যটি হুজুরকে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর লাশের উপর একটি কাগজে লিখে রাখে  MISCREANT (দুষ্কৃতিকারী)।

 

খবর পেলাম, চন্দ্রগঞ্জ বাজারের অদূরে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সামনাসামনি যুদ্ধে পাগলা শামসু শহীদ হয়েছে।