প্রবাসে
মুসলমানদের জন্য অন্যতম বড়ো ধর্মীয় উত্সব হচ্ছে ঈদুল আজহা। এই ঈদকে নিয়ে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন আশা-আকাঙ্ক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। ঈদ আসার আগেই সবাই ঈদের বহুমাত্রিক আনন্দকে ভাগ করে নিতে প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু প্রবাসীরা...? প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল-সবুজের সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলের অপরূপ বাংলাদেশ। ঈদ আছে। নেই ঈদের আনন্দ। প্রতিবেশীও আছে। নেই মনের মতন প্রতিবেশী। এই খণ্ড খণ্ড হূদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এত চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে স্বদেশের আঙিনায়। প্রবাসে বসবাস করা কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে তাদের ঈদ অনুভূতির কথা জানাচ্ছেন— রুমান হাফিজ
লন্ডনের ইলফোর্ডে পরিবারসহ বসবাস করছেন রুবা তানজিদা। দেশের মতো ঈদের আমেজ প্রবাসে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যারা প্রবাসে তারাও ঈদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে থাকেন, যেহেতু যাপিত জীবনের সপ্তাহের সাত দিন নানারকম ব্যস্ততার মধ্যে আমার কাটে, তাই ঈদের দিন স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ভীষণ উপভোগ করি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের ঘরে আপ্যায়ন করি, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাই।
স্বদেশের মতো ঈদের আমেজ প্রবাসে তেমন নেই, ছেলেবেলায় ঈদের আগের রাতে মা-খালা-চাচিদের পিঠা বানানোর প্রতিযোগিতা চলত, হাতে মেহেদি পরা, নতুন জামাকাপড়, জুতো পরে ঘুরে বেড়ানো, পরিবারের মুরুব্বিদের কাছ থেকে সালামি হিসেবে টাকা নেওয়া, যেন অন্যরকম এক অনুভূতি, সুখ ছিল। সব যেন এখন স্মৃতি, প্রবাসে সাধ্যমতো ঈদের দিন ছুটিতে পরিবারকে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করার যথাযথ চেষ্টা করি, যাতে পরিবারের প্রত্যেক সদস্য যেন এই দিন হাসি-খুশিতে ঈদ উদযাপন করে, প্রবাসে আসা জীবিকার তাগিদে স্বামী ও সংসারের জন্য তাই কঠিন বাস্তবতার নিরিখে সত্যকে মানিয়ে নিয়ে চলা এক জীবন।
সামিরা সিদ্দীকা। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন তিনি বসবাস করছেন কানাডায়। পড়ছেন সেখানকার লেথব্রীজ ইউনিভার্সিটিতে। দেশের বর্ণিল ঈদ স্বপ্নেও সেখানে ধরা দেয় না বলে মনে করেন এই তরুণী। যে কোনো উত্সব এলেই দেশের কথা খুব মনে পড়ে। সবচেয়ে মিস করি ঈদের আনন্দ, সবার সঙ্গে দেখা হওয়া, এ বাসা ও বাসায় নানান রকম খাওয়া-দাওয়া। লেখাপড়া ও থিসিসের কাজে প্রচুর ব্যস্ত থাকতে হয় এবং রুমে ফিরে নিজের কাজও করতে হয়। তাই দেশের মতো তেমনটা সময়ও পাওয়া যায় না।
এখানে ঈদ মানে সেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পসে বাঙালি কমিউনিটির সবাই একত্রে মিলিত হয়ে ‘ওয়ান ডিস পার্টি’র আয়োজন করি। সবাই আমরা নিজেরাই কোনো একটা আইটেম রান্না করে নিয়ে আসি এবং একত্রে মজা করতে করতে খাওয়ার পর্ব শেষ করি। এরপর শুরু হয় গল্প, নাচগান। এভাবেই আমরা ঈদের আনন্দ একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে দিনটা কাটিয়ে দেই। দেশের বর্ণিল ঈদের ছবি এখানে স্বপ্নেও ধরা দেয় না। তবুও মনের ভেতর একটা শূন্যতা, একটু অপূর্ণতা থেকেই যায়, বাস্তবতা যেখানে মেনে নিতে হয়।
প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিবার-পরিজন সবাইকে নিয়ে লন্ডনে বসবাস করে আসছেন মাশ-হুদা চৌধুরী মীনা। এত বছর পরেও দেশের ঈদ নিয়ে তার ভাবনার কথা জানালেন এভাবে— আমি যখন প্রথম এদেশে আসি তখন এখানে ঈদ উত্সবের কোনো আমেজ বা আনন্দ ছিল না। ঈদ নিয়ে কোথাও কোনো আয়োজন চোখে পড়ত না। সবকিছু কেমন জানি সাদামাটা, রংহীন ছিল। এর কারণ হয়তো তখন খুব বেশি বাঙালি ছিল না। এখন এদেশে অনেক অনেক বাঙালি এসেছেন। আমাদের সবার পরিবার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে বড়ো হয়েছে। আত্মীয়তার গণ্ডি সীমানা ছাড়িয়েছে। এখন ঈদের আমেজ দেশের মতো না হলেও অনেক বেশি কাছাকাছি পাওয়া যায়। ঈদের দিনটিতে ছুটি মিলে কর্মস্থল থেকে। পরিবারের সবার ভেতরে একটা উত্সব উত্সব সাড়া জাগে ঈদ নিয়ে।
প্রত্যেক এরিয়াতে সকালে ঈদের জামাত হয় মসজিদে বা খোলা মাঠে। ফিরে আসার পর মেহমান, আত্মীয়-স্বজন আসেন। দুপুরে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করি। ঈদের কেনাকাটা হয় যার যার সামর্থ্য ও রুচি অনুযায়ী। বিকেলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাই। ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। দেশে যে উত্সবের আমেজ বা ঈদের যে আনন্দ এখানে সেটা পুরোপুরি পাওয়া যায় না। তবুও সবাই যার যার মতো করে উপভোগ করে, আনন্দ করে। সবকিছুর পরেও আমি কিন্তু আমার দেশ ও দেশের ঈদ মিস করি। দেশে রমজান আরম্ভ হতেই ঈদের আমেজ, ঘুরে-ঘুরে সবাই মিলে পছন্দের কেনাকাটা করা। ঈদের দিনে দল বেঁধে বেড়ানো, বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোড়, ঈদ সালামি নিয়ে তাদের উত্তেজনা এ সবকিছুই মিস করি। সবকিছুর পরে আমার দেশ, আমার মাতৃভূমি। যেখানটায় আমার সব স্মৃতি, সব ভালোবাসা।
