>> রুমান হাফিজ
এলাকার গরিব ও চা শ্রমিকদের সন্তানদের অল্প বয়সে পড়ালেখা থেকে ছিটকে পড়া, বাল্যবিবাহ, মাদকের বিস্তার রোধের ভাবনায় ডুবে থাকতেন মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার তরুণ মিফতাহ আহমেদ লিটন। ত্রুটিপূর্ণ জায়গাগুলোতে পরিবর্তনের পাশাপাশি পিছিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা করার লক্ষ্যে শুরু করেন প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের যাত্রা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠনের কার্যক্রম উপস্থাপনে খুব কম সময়ে প্রত্যয়ের নাম ছড়িয়ে যায় সবার কাছে। একে একে অনেকেই সংগঠনের পাশে এসে দাঁড়ান।
প্রত্যয়ের মাধ্যমে বর্তমানে ৭০ জন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চলছে, পাশাপাশি চলছে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। এখন পর্যন্ত আইসিটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন ৩০০ জন চা শ্রমিক ও সুবিধাবঞ্চিতদের সন্তানেরা। মূলত সুবিধাবঞ্চিত এসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচে সহযোগিতা করা, বন্যা মোকাবিলা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিস্তার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, মাদক, জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ বিরোধী সচেতনতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি চালু, পিএসআর ফ্রি ফ্রাইডে স্কুলের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে কাজ করছে প্রত্যয়। মৌলভীবাজারের জুড়ির সন্তান তারা।
প্রত্যয় ফ্রি ফ্রাইডে স্কুল
শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে চা শ্রমিক বাবু লাল দাসের বারান্দায় গড়ে তোলা হয় প্রত্যয় শেখ রাসেল ফ্রি ফ্রাইডে স্কুল। যেসব শিশুরা শিক্ষা সুবিধাবঞ্চিত হয়ে নানা কারণে চা শ্রমিকের কাজ করত তাদের বেশিরভাগই এখন এই স্কুলের শিক্ষার্থী। শুরুতে শিশুদের স্কুলগামী করতে বেশ বেগ পোহাতে হলেও এখন সেই চিত্রটার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সেখানে গত দুই বছরে ২৫০ জনকে বিনামূল্যে পাঠদান, তাদের বিতর্ক, কুইজ, আইসিটি, মাদক বিরোধী ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ট্রেনিং প্রদানসহ বছরব্যাপী শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা ও ঝরে পড়া রোধে কাজ করছে। বর্তমানে স্কুলটি মিফতাহ আমমেদ লিটনের নিজস্ব জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
প্রযুক্তির ভাবনায়
প্রযুক্তিকে কিভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে তথা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। সে ধারণা থেকে কাজ শুরু প্রযুক্তি নিয়ে। বঞ্চিত এ জনগোষ্ঠীর সন্তানদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি ৩টি কম্পিউটার দিয়ে। এক বছর এই প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। ‘টেকনোলজি ফর টি’ নামে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বর্তমানে প্রশিক্ষণ চলমান। এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে আইটি মন্ত্রণালয় থেকে প্রণোদনা পুরস্কার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন। এ অর্থ দিয়ে ৭টি কম্পিউটার কিনে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। এখন আরো একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ‘প্রযুক্তি এখন সবার দোরগোড়ায়’ এ স্লোগানে ইউনিয়নভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলছে। যা চলবে আগামী ৩ বছর।
দূর করে সব বাধা
যেকোনো ভালো কাজে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। যার ব্যতিক্রম হয়নি প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রেও। শুরুর দিকটাতে নানা বাধা সামলাতে হয়েছে তাদের। নানা জনের কটুবাক্য, গালমন্দের সাথে বিছিয়ে রাখা কাঁটা উপড়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে এখনো। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য এসব বাধা মাড়িয়ে চলতে সর্বদা প্রস্তুত প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের সদস্যরা। প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মিফতাহ আহমেদ লিটন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে ২০১৬ সালে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করেন। লিটন বললেন, ‘পুরস্কার ও যেকোনো অর্জন সবসময় অনুপ্রেরণার। কারণ সে সময় এক হাজারেরও বেশি তরুণ মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তার মধ্যে আমিও মনোনয়ন পেয়েছিলাম। এই পুরস্কার গ্রহণের পর সাংগঠনিকভাবে সংগঠনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।’
সামনের দিনগুলোতে
বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেকনোলজি ফর টি প্রজেক্টটি দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়া, সীমান্তবর্তী এলাকার পিছিয়ে পড়া নারীদের তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নত ও টেকসই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা। ‘ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স’ এবং টেকনোলজি ফর অল নামে আরেকটি প্রজেক্ট চালু করা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করা, শ্রমিকদের সন্তাদের নিয়মিত বিনামূল্যে পাঠদান ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করাসহ আরো এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প রয়েছে প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের।
