ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টিকসই রাষ্ট্র গড়িতে হইবে

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:২৮

আজ ২৬শে মার্চ—বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস। একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু দিন থাকে, যাহা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাহা পরিণত হয় জাতিসত্তার চিরন্তন পরিচয়ে। বাংলাদেশের জন্য ২৬শে মার্চ তেমনই এক দিবস—যাহা আমাদের অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা এবং সংগ্রামী চেতনার সম্মিলিত প্রতীক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা হঠাৎ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নহে—ইহা একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার পরিণতি। ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব হইতে শুরু করিয়া পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান–প্রতিটি ধাপই ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার ক্রমবর্ধমান প্রয়াস। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতারণা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়ন সেই আকাঙ্ক্ষাকে স্বাধীনতার অপরিহার্যতায় রূপান্তরিত করে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রি সেই ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম মোড়। ‘অপারেশন সার্চলাইট’- এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির উপর যে বর্বর গণহত্যা চালানো হয়, তাহা কেবল একটি জাতিকে স্তব্ধ করিবার প্রয়াস ছিল না—ইহা ছিল তাহার অস্তিত্ব মুছিয়া ফেলিবার এক পরিকল্পিত চেষ্টা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দমন যতই নির্মম হউক, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ততই তীব্র হয়। সেই রাত্রির অন্ধকারেই জন্ম লয় এক দীপ্ত প্রত্যয়—স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের অঙ্গীকার।

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর অধিক সময় পর আজ আমরা যখন পিছন ফিরিয়া তাকাই, তখন অগ্রগতির একটি সুস্পষ্ট চিত্র চোখে পড়ে। গ্রাম হইতে শহর পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া পৌছাইয়াছে— যাহা একসময় কল্পনাতীত ছিল। কিন্তু আমাদের মনে রাখিতে হইবে–স্বাধীনতার মূল প্রতিশ্রুতি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তবতা হইল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ন্যায়বিচারের ঘাটতি আজও দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হইয়াছে দৃশ্যমান, কিন্তু সুবিচার ও সুশাসনের ভিত রহিয়া গিয়াছে দুর্বল। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তাহার অবকাঠামো নয়—তাহার প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের মর্যাদাবোধ। এইখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি স্বাধীনতা কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিমাপে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহা হইলে তাহা অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন সাধারণ নাগরিকও রাষ্ট্রের নিকট ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং সম্মান পাইতে পারে। অপরদিকে, বর্তমান প্রজন্মের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সময়ে তরুণসমাজ যেইভাবে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে সোচ্চার হইয়াছে, তাহা আমাদের আশাবাদী করে। ইতিহাস প্রমাণ করে—যে জাতির তরুণরা সচেতন, সেই জাতির স্বাধীনতা কখনো স্থবির হয় না। কিন্তু এই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব।

বস্তুত, স্বাধীনতা একটি চূড়ান্ত অর্জন নহে—ইহা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইহাকে রক্ষা করিতে হয় প্রতিনিয়ত—ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যমে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করিবার মাধ্যমে। অন্যথায়, স্বাধীনতার বাহ্যিক রূপ থাকিলেও তাহার আত্মা ক্রমশ ক্ষীণ হইতে পারে। আজিকার এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করি স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে—যাহার নেতৃত্ব ব্যতীত এই ইতিহাস কল্পনাতীত। স্মরণ করি মেজর জিয়াউর রহমানকে—যিনি কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র হইতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সেনাপতিগণ, এম এ জি ওসমানী, সেক্টর কমান্ডারগণ এবং জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ আমরা স্মরণ করি ত্রিশ লক্ষ শহিদ, সম্ভ্রমহারা দুই লক্ষ মা-বোন এবং অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে—যাহাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হইয়াছে এই স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা আমাদের জন্য এক গৌরবময় উত্তরাধিকার, কিন্তু একই সঙ্গে এক কঠিন দায়। এই দায় হইল—একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টিকসই রাষ্ট্র গড়িয়া তোলা। যদি আমরা সেই দায় পালন করিতে ব্যর্থ হই, তাহা হইলে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ অপূর্ণই রহিয়া যাইবে। আর যদি সফল হই—তাহা হইলে ২৬শে মার্চ কেবল স্মৃতির দিবস নহে, ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক হইয়া উঠিবে।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন