সেবার সম্পর্কই সমাজের সত্যিকারের সৌন্দর্য

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৯

নদীবিধৌত চাঁদপুরের নৌপথে সম্প্রতি মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত উন্মোচিত হইয়াছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, মতলব উপজেলার জহিরাবাদ চর উমেদ এলাকা হইতে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে যাত্রাপথে এক গর্ভবতী নারীর আকস্মিক প্রসববেদনা শুরু হইলে উপায়ন্তরহীন অবস্থার মুখে স্থানীয়দের ঐকান্তিক সহযোগিতায় লঞ্চের মধ্যেই এক কন্যাশিশুর জন্ম হয়। ইহা নিছক একটি সংবাদ নহে; বরং আমাদের সমাজে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সেবার সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে পুলিশ, স্থানীয় সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী এবং লঞ্চ কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে যেই সহমর্মিতার পরিচয় দিয়াছেন, তাহা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কারণ, সমাজে সেবা প্রদানকারী ও সেবা গ্রহণকারীর সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা, অবিশ্বাস কিংবা দূরত্বের আবরণে আবদ্ধ থাকিয়া যায়। তথাপি সেই যান্ত্রিক সম্পর্কের মধ্যে যখন মমতা, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধের উষ্ণতা যুক্ত হয়, তখনই তাহা সমাজকে করিয়া তোলে আলোকিত। চাঁদপুরের ঘটনাটি যেন সেইরূপ আলোরই প্রতিচ্ছবি।

অর্থাৎ, যখন দায়িত্বের সঙ্গে মানবিকতার সংযোগ ঘটে, তখন সেই সম্পর্ক কেবল প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাহা রূপ লয় এক আন্তরিক সামাজিক বন্ধনে। পুলিশ কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবেই নয়, বরং মানবিক সহায়তাকারী হিসাবেও যে মানুষের পাশে দাঁড়াইতে পারে, এই ঘটনা তাহা আবারও প্রমাণ করিল। স্থানীয় সংবাদকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের ত্বরিত উপস্থিতিতে ইহাই প্রমাণ হয় যে, সামাজিক স্তরবিন্যাসে দায়িত্বশীল মানুষের সংখ্যাও খুব নগণ্য নহে। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করিতে হয় লঞ্চ মালিকের মানবিক উদ্যোগের কথা। নবজাতকের পরিবারকে তাহারা তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করিয়াছেন, উপহার হিসাবে দিয়াছেন নূতন পোশাক। ঘটনা এতটুকুতেই থামিয়া থাকে নাই—শিশুটির ভবিষ্যৎ যাতায়াত ভাড়া আজীবনের জন্য মওকুফ ঘোষণা করা হইয়াছে। ইহা নিঃসন্দেহে বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ব্যাবসায়িক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠিয়া একজন সেবাদাতা যখন এইভাবে মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিয়া থাকেন, তখন তাহা সমাজের জন্য হইয়া উঠে এক ইতিবাচক বার্তা। ইহাতে সমাজ হইয়া উঠে আরও সুন্দর, সহমর্মী, আলোকিত এবং নিরাপদ ও বাসযোগ্য। এই সংস্কৃতি আস্থা ও সৌহার্দের সংস্কৃতি গঠনেও অত্যন্ত সহায়ক।

আমাদের সমাজে অবশ্য এমন দৃষ্টান্ত নূতন নহে। বিভিন্ন সময় দেখা গিয়াছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে পথচারীরা দ্রুত হাসপাতালে লইয়া গিয়াছেন; রেল স্টেশনে অসুস্থ যাত্রীকে রেল পুলিশ ও সাধারণ মানুষ একযোগে সাহায্য করিয়াছেন; নদীপথে বিপদগ্রস্ত যাত্রীদের উদ্ধার করিতে মাঝি, নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় জনতা একযোগে আগাইয়া আসিয়াছেন। করোনা মহামারির সময় চিকিৎসক, নার্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর আত্মনিবেদিত সেবার কথা আমাদের স্মৃতিতে এখনও সমুজ্জ্বল। এই সকল ঘটনা প্রমাণ করে, মানবিকতার সংস্কৃতি সদা বহমান, প্রয়োজন কেবল উহাকে আরও ছড়াইয়া দেওয়া।

বিদেশের মাটিতেও এই ধরনের মানবিক উদ্যোগের দৃষ্টান্ত কম নহে। বিশেষ করিয়া, জলবেষ্টিত বা দুর্গম অঞ্চলগুলিতে প্রায়ই মানবিকতার জয়ধ্বনি বাজিয়া উঠিতে দেখা যায়। এমন সংস্কৃতি বা নিয়মের কথাও আমরা জানি—যাহা এখনও ক্ষেত্রবিশেষে বলবৎ—উহা হইল, কোনো দেশের পতাকাবাহী লঞ্চ বা বিমানে নবজাতক জন্মগ্রহণ করিলে সে সেই দেশের নাগরিকত্ব পাইয়া থাকে; বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ বটে। খোদ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলি এই সকল উদ্যোগকে সেবামূলক সংস্কৃতির এক আদর্শ মডেল হিসাবে সাধুবাদ জানাইয়া থাকে। অর্থাৎ, সকল সমাজে মানবিক সম্পর্কই হইল সেবার প্রাণ।

একটি সভ্য সমাজের আসল পরিচয় কোথায়? কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নে? অবশ্যই নহে; বরং সংকটে মানুষ মানুষের পাশে কত দ্রুত ও আন্তরিকভাবে দাঁড়ায়, সেইখানে। বিশেষত, সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক যত সুদৃঢ় হইবে, সমাজ জীবন হইয়া উঠিবে ততই মানবিক ও বাসযোগ্য। সামাজিক সম্প্রীতি, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করিবার প্রশ্নেও ইহা জরুরি। প্রশাসন, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ—সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল এই সংস্কৃতি ‘চির সবুজ’ থাকিতে পারে। অতএব, আজিকার অবিশ্বাস, স্বার্থপরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার যুগে এই সংস্কৃতিকে নেহাত ব্যতিক্রম হিসাবে না দেখিয়া বরং উহাকে নিয়মে পরিণত করাই কি সমুচিত নহে?

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন