শিশু-কিশোর অপরাধ ও আইনের সংশোধন

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০০

সাম্প্রতিক কালে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাইতেছে যে সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, তাহার অন্যতম কারণ উঠতি বয়সি কিশোরগণের অপরাধপ্রবণতা। বিষয়টি এখন আর কেবল পারিবারিক দুশ্চিন্তার কারণ নহে, বরং জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আইন কমিশনের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন হইতে যে ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহাতে দেখা যায় যে, অপরাধে লিপ্ত শিশুদের একটি বিশাল অংশ-অর্থাৎ প্রায় ৪৬ শতাংশই ১৬ হইতে ১৮ বৎসর বয়সি। হত্যা, ধর্ষণ, মাদক ও ডাকাতির ন্যায় গুরুতর অপরাধে এই বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের সম্পৃক্ততা সমাজব্যবস্থাকে এক চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে। এমতাবস্থায়, প্রচলিত শিশু আইনের সংশোধন ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শিশুদের বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণ করিবার বিষয়টি আজ সময়ের অনিবার্য দাবিতে পরিণত হইয়াছে।

বাংলাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন আইনে শিশুর সংজ্ঞার মধ্যে যে বৈপরীত্য রহিয়াছে, তাহা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। 'শিশু আইন, ২০১৩' অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১৮ বৎসর বয়সি সকল ব্যক্তিই শিশু। অথচ 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০'-এ ১৬ বৎসর পর্যন্ত ব্যক্তিকে শিশু এবং তৎপরবর্তী বয়সিদের কিশোর হিসাবে গণ্য করা হইয়াছে। আবার 'দ্য মেজরিটি অ্যাক্ট, ১৮৭৫' অনুযায়ী ১৮ বৎসর হইলেই একজন ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক বলিয়া বিবেচিত হন। আইনের এই দ্বিমুখী অবস্থানের সুযোগ লইতেছে ধূর্ত অপরাধী ও দাগী সন্ত্রাসীরা। তাহারা জানিয়া গিয়াছে যে, ১৮ বৎসর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত গুরুতর অপরাধ করিলেও শিশু আইনের দোহাই দিয়া কঠোর শাস্তি হইতে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই আইনি সীমাবদ্ধতাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করিয়া 'কিশোর গ্যাং'-এর পৃষ্ঠপোষকগণ কোমলমতি কিশোরদের দিয়া ঘাতক বাহিনীর ন্যায় দুষ্কর্ম করাইয়া লইতেছে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, গাজীপুর ও যশোরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রসমূহে অবস্থানরত শিশুদের সিংহভাগই ১৬ হইতে ১৮ বৎসর বয়সি এবং তাহাদের বিরুদ্ধেই হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধের অভিযোগ অধিক। এই বয়সের কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক গঠন অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্তবয়স্কদের ন্যায় বিকশিত হয়। তাহারা অপরাধের গুরুত্ব ও ফলাফল অনুধাবন করিবার সক্ষমতা রাখে। অথচ আইনের রক্ষাকবচ তাহাদের বেপরোয়া করিয়া তুলিতেছে। আইন কমিশনের সেমিনারে অংশ নেওয়া ৯৪ ভাগ অংশীজন এই বয়সসীমা পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়াছেন। সুতরাং, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করিয়া এবং পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা বিচার করিয়া গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে শিশুদের বয়সসীমা ১৮ হইতে ১৬ বছরে নামাইয়া আনার বিষয়টি সরকারের গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা উচিত।

কেবল আইন কঠোর করিলেই এই সমস্যার সমাধান হইবে না। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রসমূহের শোচনীয় অবস্থাও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করিতেছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিশু রাখিবার ফলে, সেইখানে প্রকৃত সংশোধন অপেক্ষা অপরাধের দীক্ষা গ্রহণই অধিক হইতেছে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এই ব্যাধি হইতে মুক্ত করিতে হইলে কিশোর গ্যাং কালচারের মূল উৎপাটন করিতে হইবে। যাহারা আড়াল হইতে এই শিশুদের বিপথে চালিত করিতেছে, তাহাদের আইনের আওতায় আনা সর্বাগ্রে প্রয়োজন।

পরিশেষে আমরা ইহাই বলিব যে, আধুনিক বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া এবং দেশের নিজস্ব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করিয়া শিশু আইন সংশোধন করা হউক। শিশুদের সুরক্ষার নামে অপরাধীদের আশকারা দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নহে। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে জাগ্রত হইতে হইবে। আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করিয়া কিশোর অপরাধীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত সংশোধনাগার গড়িয়া তোলাই হইবে এই মুহূর্তের প্রধান কর্তব্য। নতুবা আগামীর ভবিষ্যৎ এক অন্ধকার গহ্বরে তলাইয়া যাইবে, যাহার দায়ভার এই জাতিকেই বহন করিতে হইবে।

কেবল আইন কঠোর করিলেই এই সমস্যার সমাধান হইবে না। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রসমূহের শোচনীয় অবস্থাও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করিতেছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিশু রাখিবার ফলে, সেইখানে প্রকৃত সংশোধন অপেক্ষা অপরাধের দীক্ষা গ্রহণই অধিক হইতেছে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এই ব্যাধি হইতে মুক্ত করিতে হইলে কিশোর গ্যাং কালচারের মূল উৎপাটন করিতে হইবে। যাহারা আড়াল হইতে এই শিশুদের বিপথে চালিত করিতেছে, তাহাদের আইনের আওতায় আনা সর্বাগ্রে প্রয়োজন।

পরিশেষে আমরা ইহাই বলিব যে, আধুনিক বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া এবং দেশের নিজস্ব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করিয়া শিশু আইন সংশোধন করা হউক। শিশুদের সুরক্ষার নামে অপরাধীদের আশকারা দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নহে। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে জাগ্রত হইতে হইবে। আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করিয়া কিশোর অপরাধীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত সংশোধনাগার গড়িয়া তোলাই হইবে এই মুহূর্তের প্রধান কর্তব্য। নতুবা আগামীর ভবিষ্যৎ এক অন্ধকার গহ্বরে তলাইয়া যাইবে, যাহার দায়ভার এই জাতিকেই বহন করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন