বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রুখতে হবে ‘কিশোর গ্যাং কালচার’ 

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২২, ০০:২০

গ্রাম কি শহর—সর্বত্রই বাড়ছে কিশোর-অপরাধ। এদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেও বিপাকে পড়ছেন প্রতিবেশীরা। একসঙ্গে একদল কিশোর দেখলেই আজকাল কেমন যেন ভয় ভয় লাগে! এদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। পরিবারের অনুশাসন, নির্দেশনা না পেয়ে বখাটের খাতায় নাম ওঠে এদের। এমনও ঘটতে দেখা যায়, এদের পরিবারের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায় না। উলটো পরিবার থেকে আসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তাই আত্মসম্মানের ভয়ে অনেকে দেখেও না-দেখার ভান করেন।

অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যাতে নাম যুক্ত হয়নি কিশোরদের একটি বড় অংশের। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এদের বেপরোয়া চলাফেরা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না কিছুতেই। হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। এলাকার বড় ভাইদের প্রভাববলয়ে থেকে এরা গুরুতর অপরাধ কর্মকাণ্ড সংঘটনে সিদ্ধহস্ত। এদের দৌরাত্ম্য কর্মবর্ধমান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা যারা অপরাধে জড়াচ্ছে তাদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এরা যত বড় অপরাধই করুক না কেন, তাদের শিশু আইনে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। ঐ আইনে হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড। ফলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অপরাধ করে লঘু শাস্তির আওতায় পড়ছে। এজন্য শিশু অপরাধীদের বয়সসীমা কমিয়ে আনা যায় কি না, সেই বিষয়ে সরকারকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। যদি শিশুর বয়সসীমা পুনর্নিধারণ না করা হয়, তাহলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

সন্ত্রাসীচক্রের সদস্যরা দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে টানে। সাহসী ও বুদ্ধিমান কিশোরদের চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাটো অপরাধের বাইরেও মাদক বিক্রি, অস্ত্র ও বোমা বহনের মতো মারাত্মক কাজে ব্যবহার করানোর অভিযোগ আছে। এভাবে অর্থের প্রলোভনে পড়ে কিশোররা এক সময় অপরাধজগতের স্থায়ী সদস্যে পরিণত হয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আধুনিক বিশ্বের অসংগঠিত সমাজব্যবস্থায় দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের নেতিবাচক ফল হলো কিশোর অপরাধ। পরিবার কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন, শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং সমাজ-জীবনে বিরাজমান নৈরাজ্য ও হতাশা কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। অপসংস্কৃতির বাঁধভাঙা জোয়ারও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। পরিষ্কার করে বলতে গেলে, কম বয়সে অপরিমিত অর্থপ্রাপ্তি, অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে প্রযুক্তি পণ্য, অসৎ সঙ্গ, অতিরিক্ত উচ্চাশা, পারিবারিক হতাশা, রাজনৈতিক সংস্পর্শ ও অপসংস্কৃতির ছোঁয়া কিশোর-কিশোরীদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।

পুলিশ ও র‍্যাবের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরেই ৫০টিরও বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। আরো আতঙ্কের বিষয় হলো, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ২৩০ সদস্য পুলিশের লাল তালিকাভুক্ত। সারা দেশে সক্রিয় গ্যাং সদস্য প্রায় ১০ হাজার! এমতাবস্থায়, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে বড় চ্যালেঞ্জ বলেই বিবেচনা করছে বাংলাদেশ পুলিশ। কাজেই কিশোর গ্যাং যদি এখনই প্রতিহত ও নির্মূল করা না যায়, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মধ্যে মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের কিছু সদস্য গ্রেফতার করে মিডিয়ার সামনে হাজির করে ঠিকই, তবে তাতে আশানুরূপ লাভ হচ্ছে না। যেহেতু কিশোরদের অপরাধের ক্ষেত্রে সংশোধনাগারে পাঠানো ছাড়া কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই এক্ষেত্রে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে।

পাশাপাশি কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার অভিভাবক শ্রেণির সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে কিশোরদের সুপথে পরিচালিত করা যায়, এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়মিত বৈঠক করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সমাজ ও পরিবারের অভিভাবকদের জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। নিজ সন্তানের চলাফেরা ও আচার-আচরণের পরিবর্তনের দিকে তাদের খেয়াল রাখতে হবে। শিশু-কিশোরদের নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। সর্বোপরি, রুখতে হবে ‘কিশোর গ্যাং কালচার’।

লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন