দৈনিক ইত্তেফাক, ডিএই ও সিনজেনটা বাংলাদেশের ওয়েবিনারে বক্তারা

কৃষিজ উপকরণের নকল ও ভেজাল প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৫

কৃষিজ উপকরণের ক্ষেত্রে নকল ও ভেজালের প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কৃষক যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছেন ঠিক তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় নকল ও ভেজালের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা খুব প্রয়োজন। এটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালাগুলো যুগোপযোগী করা,  একই সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগে এ বিষয়ে আলাদা সেল গঠন করে এবং তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের প্রয়োজন।

রোববার (৫ এপ্রিল) ‘নকল ও ভেজালকে না’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল রাউন্ডটেবিলে এসব কথা বলেন বক্তারা। দৈনিক ইত্তেফাক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড যৌথভাবে এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ)। স্বাগত বক্তব্য দেন সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাজারে নকল এপি নম্বর ব্যবহার, একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর একাধিক ভিন্ন পণ্যে প্রয়োগ এবং কোনো নিবন্ধন বা কোম্পানির নাম ছাড়াই পণ্য বিক্রির মতো গুরুতর অনিয়ম ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনিবন্ধিত এবং সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করা বিদেশি কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। নকল ও ভেজাল কৃষিজ উপকরণের কারণে প্রতি বছর দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ,  মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে, সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যার উত্তরণ করা সম্ভব বলে মতামত দেন তিনি। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুর রহিম বলেন, উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগ পেস্টিসাইড আইন ও বিধিমালা এবং কোয়ারেন্টাইন আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছে। একই সঙ্গে সার নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, জৈব কৃষি নীতিমালা, গ্যাপ নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং বীজের মান নিশ্চিত করতে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সিকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য ভেজাল কীটনাশক ও সারের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে রোধ করা এবং মাটি-পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব কমানো। কৃষিকে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে নকল ও ভেজাল কৃষিজ উপকরণের বিরুদ্ধে আমাদের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।”

খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, কৃষকরা প্রায়ই ভুল পরামর্শের শিকার হচ্ছেন, যার ফলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ সমস্যার সমাধানের উপায় হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে ছোট ল্যাব এবং স্বল্প খরচে সার ও কীটনাশক পরীক্ষার জন্য ‘মোবাইল ল্যাব’ চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ডিএই’র উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের উপপরিচালক (বালাইনাশক ও মান নিয়ন্ত্রণ) কাজী শফিকুল ইসলাম বলেন, বালাইনাশক আইন ২০১৮-এর অধীনে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান। এখন থেকে প্রতিটি বালাইনাশকের প্যাকেটের ভেতরে নির্দেশনাসমৃদ্ধ আলাদা লিফলেট সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতা ও ডিলার পর্যায়ে ন্যূনতম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, প্রতিটি অনুমোদিত বালাইনাশকের বোতলে থাকা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ডিএই’র ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। বালাইনাশক আইন মোবাইল কোর্টের তফসিলভুক্ত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে। তিনি নকল ও ভেজালবিরোধী কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ) তাহমিনা বেগম বলেন, ভেজালের কারণে কৃষক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে সার, বীজ ও কীটনাশকের ওজনে কারচুপি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং মোড়কে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকলে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে। নকল পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে বলেও তিনি জানান।

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান প্রতিবেদক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, কৃষি দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু নকল ও ভেজাল কৃষিজ উপকরণের কারণে এই খাত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি ভেজাল ও নকল প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সেল গঠন এবং বিদ্যমান আইনের যুগোপযোগী ও কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দেন।

ওয়েবিনারে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)-এর উপ-মহাসচিব মাসুদুর রহমান, বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) এর প্রতিনিধি, বিভিন্ন পর্যায়ের রিটেইলার, কৃষক এবং বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি