দক্ষ জনবলের অভাবে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে এক যুগেও চালু হয়নি কোটি টাকা মূল্যের চারটি আইসিইউ। দীর্ঘ সময় পড়ে থেকে অকেজো হয়ে গেছে আইসিইউগুলো। তাই ১০টি নতুন আইসিইউ ও প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদা দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। জামালপুর ২৬ লাখ মানুষসহ শেরপুর, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার কিছু অংশের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল।
লাখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই বছরের ৩১ জানুয়ারি কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ চার শয্যার আইসিইউ সেবা চালু করা হয়। কিন্তু এরপর কোনো দিনও চালু হয়নি সেই আইসিইউ।আইসিইউ সেবা না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত ময়মনসিংহ বা রাজধানী ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে।এতে পথেই জীবন হারাচ্ছেন অনেক রোগী। এছাড়াও বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিতে গেলে খরচ করতে হয় লাখ লাখ টাকা।
জেলার মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রুমন আহাম্মেদ বলেন, ‘আমার বোনের সিজারের পর আমার বোন ও তার সন্তানের জন্য আইসিইউয়ের প্রয়োজন পড়ে। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও সেটি চালানো হয় না। তাই আমি তাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে আইসিইউয়ের জন্য সাত দিনে ৩ লাখ টাকা বিল হয়। এখন জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ চালু থাকলে তো আমাদের বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হতো না। আমাদের মতো কৃষক ও গরিব মানুষদের লাখ লাখ টাকা বিল নিয়ে চিন্তা করতে হতো না।’
সদর উপজেলার নরুন্দি ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আল আমিন ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সালের জুলাই মাসে আমার বাবার হার্টে সমস্যা ধরা পড়ে। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নিতে বলে এবং জামালপুরে না থাকায় ময়মনসিংহে স্থানান্তর করে। কিন্তু ময়মনসিংহে নেওয়ার সময় পথেই আমার বাবা মারা যান। জামালপুরে আইসিইউ সেবাটি চালু থাকলে হয়তো আমার বাবা মারা যেত না।’
জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতার কারণে আজ এই অবস্থা। যন্ত্রপাতি দিয়েছে কিন্তু দক্ষ জনবল দেয়নি। এমন উদাসীনতা আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই জেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
গতকাল বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়—মূল ভবনের দক্ষিণ পাশের ভবনটির তৃতীয় তলার দেওয়ালে লেখা আইসিইউ। সেখানকার আইসিইউয়ের কক্ষে তালা ঝুলছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কক্ষটি খুলে দেন সেখানকার দায়িত্বে থাকা পারুল ইসলাম। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যন্ত্রপাতিগুলো, দীর্ঘদিন ব্যবহার না করাই ভেতরে লাইটগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে, বিছানাগুলোও ব্যবহারহীন। কোটি টাকার এই অবকাঠামো যেন শুধুই নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অব্যবস্থাপনার।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. রনি জানান আইসিইউ কক্ষের ভেতরে মোট চারটি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে দুইটি আইসিইউ ও দুইটি উচ্চমাত্রার নির্ভরশীল (এইচডিইউ) শয্যা। প্রতিটি শয্যার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতি লাগানো রয়েছে। এই আইসিইউসহ পুরো সেবা চালু করতে কত টাকা খরচ হয়েছে, সে সম্পর্কে হাসপাতালের কারোর ধারণা নেই। ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।
জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আইসিইউগুলোকে অকেজো বা বাতিল বলে ঘোষণা করেছে।
ডা. মো. মাহফুজুর রহমান সোহান আরও বলেন, ‘গত মাসে (মার্চ) ১০টি আইসিইউ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত জনবল চেয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র পাঠিয়েছি। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নজরে নিয়ে আমাদের চাহিদামতো আইসিইউ পাঠালে এবার সব সমস্যার সমাধান হবে।’
