টুশীর প্রতিজ্ঞা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৪২

টুশীর জেএসসি পরীক্ষা শেষ হলো মাত্র। আর পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই মেয়েটির দুষ্টুমি যেন সাতগুণ বেড়ে গেছে। অবশ্য মায়ের সামনে সে একেবারে ভেজা বেড়াল, যেন কিচ্ছুটি বোঝে না। তবে টুশীর মা ঠিকই বোঝেন—বাপহারা মেয়েটি দিনকে দিন যেন একটু বেশিই দুরন্তপনায় মেতে উঠছে। যেটা তাদের মতো গরিব মানুষদের সাথে ঠিক যায় না!

টুশীর মা সেলাইয়ের কাজ করে সংসার খরচ চালান। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে পোশাক বানান, তারপর আবার সেগুলো ডেলিভারি দেওয়ার জন্য মানুষের বাসায় বাসায় ঘুরে বেড়ান। দিনকে দিন জীবন-যাপন যেখানে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে, সেখানে মেয়েটার তো বাস্তবতা কিছু বোঝা উচিত।

বেশ ক’দিন ধরেই তিনি খেয়াল করেছেন—তিনি বাইরে গেলে কেউ একজন তার সেলাই মেশিনে বসে কিছু একটা করছে। এই কেউ একজন যে টুশী—এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। কিন্তু টুশী যে কী করছে—সেটাই ভেবে উদ্ধার করতে পারেননি তিনি।

সেদিন প্রস্তুত কাপড়গুলো ডেলিভারি দিয়ে বাসায় ফিরেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল তার। একে তো একজন কাস্টমার কতগুলো পোশাকের অর্ডার দিয়ে সেই যে গ্রামের বাড়ি গেছে, ফেরার নাম নেই। ডেলিভারি করতে না পারার কারণে অনেকগুলো টাকা আটকে আছে। বাসায় ফিরেই দেখলেন, সেলাই মেশিনের সুইটা ভাঙা। কাজটা যে টুশীর, সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অমনি বাঁশের কঞ্চি হাতে নিয়ে ছোট মেয়েটির দিকে তেড়ে গেলেন। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি সটান দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মনে পড়ল—সকালেই মেশিনের সুইটা ভেঙে গেছিল। তাড়াহুড়ায় তিনি আর সেটাকে ঠিক না করেই বাইরে বেরিয়ে গেছিলেন। তবুও মেয়েকে কপট রাগ দেখিয়ে তিনি নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

একটু পর টুশী মা’র কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

‘মা।’

‘বল।’

‘কঞ্চিটা কোত্থকে এনেছো?’

‘কেন? তোকে যাতে আর না পেটাতে পারি সেজন্য পুরো বাঁশের ঝাড়টাই উপড়ে ফেলবি নাকি!’

‘বলো না মা।’

‘জমিদার বাড়ির পেছনে একটা মুলি বাঁশের ঝোপ আছে। সেখান থেকেই এনেছি।’

‘তুমি ওখানে কেন গিয়েছিলে, মা?’

‘কেন আবার যাবো? যা তো এখান থেকে। যত্ত সব ফালতু প্রশ্ন মেয়েটার।’

টুশী মানে মানে মায়ের সামনে থেকে কেটে পড়ে।

এর কিছুদিন পরের কথা। এক সকালে অনেকগুলো ফাঁকা গুলির আওয়াজে টুশীর মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি খেয়াল করেন—পাশে মেয়েটি শুয়ে নেই। সাত সকালে টুশীটা আবার কই গেল। মেয়েটি আমাকে জ্বালিয়ে মারল। উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে উঠে পড়লেন তিনি। সামনের দরজা খোলামাত্রই চমকে গেলেন। টুশী ডান হাতের দুই আঙুল বাঁকিয়ে, বাকি তিন আঙুল সোজা রেখে, সালাম করার ভঙ্গিতে হাতটা কপালের পাশে ধরে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে!

একতলা বাসার ছাদে বাঁশের কঞ্চিতে একটা পতাকা টাঙানো হয়েছে। সকালের মৃদু বাতাসে সেটা উড়ছে পতপত করে। টুশী তার কচিকণ্ঠে সুর তুলেছে, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...

টুশীর মায়ের মুখে কোনো রা নেই। যেন কথা বলতেই ভুলে গেছেন তিনি। মেয়ের কর্মকাণ্ডে একটু নয়, অনেকখানিই অবাক হয়েছেন। বুঝতে কষ্ট হলো না—মেয়েটা এতদিন তার সেলাই মেশিন ব্যবহার করে লাল-সবুজের ওই পতাকাখানি বানিয়েছে। জমিদার বাড়ির পেছনের সেই বাঁশঝাড় থেকে নিয়ে এসেছে বাঁশের কঞ্চিটা।

তার চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

জাতীয় পতাকাকে সম্মানপ্রদর্শন শেষে গুটিগুটি পায়ে টুশী তার মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল।

‘মা, জমিদার বাড়ির পেছনের ওই জায়গাতে যাবে একটিবার?’

টুশীর মা যেন ঘোরের মধ্যে আছেন। তিনি কোনো প্রশ্ন করলেন না মেয়েটিকে। এই সাত সকালে কেন যাবেন তিনি ওখানে? আছেই বা কী ওখানে?

মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেয়ের পিছুপিছু তিনি জঙ্গলে পরিণত হওয়া পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির পেছনকার জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছালেন।

প্রায় মাটির সাথে মিশে যাওয়া হালকা উঁচু একটা জায়গা সদ্য কাটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘিরে রাখা আছে। টুশী তার মাকে নিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।

‘এটা তোমার কাজ!’ মেয়ের প্রতি মায়ের সম্বোধনটাও হঠাত্ বদলে গেছে।

‘হ্যাঁ’, বলল টুশী। ‘নানুর কবরটাকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেড়া দিয়েছি আমি।’

‘তুমি জানলে কী করে?’

‘তোমার ডায়েরি পড়ে। চলো, আজকের এই ষোলই ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের দিনে নানুর জন্য দু’হাত তুলে দোয়া করি আমরা।’

টুশীর মা তখনো ঘোরের মধ্যে। সত্যি, তার মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে। এই বয়সেই তার মধ্যে কত কত চিন্তাভাবনা কাজ করছে। টুশীর নানু ছিলেন একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীরাঙ্গনা। টুশীর মা তার একমাত্র সন্তান। মেয়েটিকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করেন তিনি। টুশী যখন খুব ছোট, তখন তিনি মারা যান। এই পরিত্যক্ত জায়গাটিতে কোনোভাবে তাঁকে কবরস্থ করা হয়। দেশের কাছ থেকে না তিনি কিছু পেয়েছেন, না তাঁর মেয়ে কিছু পেল। তবুও জীবিতাবস্থায় তিনি কোনো আক্ষেপ প্রকাশ করেননি। আক্ষেপ নেই টুশীর মায়ের মনেও। তার আক্ষেপ কেবল—ছোট্ট মেয়ে টুশী তার বাপকেও পেল না বেশিদিন। সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ গেল লোকটার। সেই থেকে টুশীকে নিয়ে মায়ের একাকী সংগ্রাম শুরু।

‘আমি বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে চাই, মা।’

টুশীর কথায় হুঁশ ফেরে মায়ের। তিনি কোনো কিছু বলার আগে টুশী পুনরায় বলে, ‘বড় হয়ে আমি মানুষের সেবা করতে চাই। গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। কেউ যাতে বিনা চিকিত্সায় মারা না যায়, অনাহারে না থাকে, বঞ্চিত না হয়। তুমি দেখে নিও—আমার কাজ দেখে তখন সকলে তোমাকে নিয়ে গর্ব করবে। সবাই বলবে, টুশীর মা একজন রত্নগর্ভা।’

টুশীর মা তখন খুশিতে আত্মহারা। মেয়েকে দু হাতে শূন্যে তুলে চরকির ন্যায় ঘুরতে লাগলেন তিনি।

এতদিনে বিজয়ের সত্যিকারের সুখ মাত্রই স্পর্শ করল তাকে।