মীর আব্দুল আলীম
আমরা হুজুগে বাঙ্গাল। কান চিলে নিয়েছে কেউ বলেছে তো, তার পিছু ছুটছি তো ছুটছিই। হাল সময়ে ‘ফেসবুক’ হুজুগে আগুন লাগিয়েছে। কেউ একজন কিছু একটা লিখেছে তো দেশশুদ্ধ হই চই শুরু হয়ে যায়। পদ্মা সেতুতে নাকি রক্ত আর কল্লা (মাথা) লাগবে। এ থেকে আতঙ্ক; ছেলেধরা আর গণপিটুনি। এ কি অবস্থা দেশে! চোখের সামনে নিরীহ মানুষ মরছে! এ আতঙ্ক দূর করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিংয়ের জন্য গিয়েছি। প্রতি জায়গাতেই আমি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করেছিলাম- “তোমাদের কোনো বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে কি কোনো ছেলেধরা নিয়ে গেছে? কারো মাথা কেটে নিয়ে গেছে?” কেউই হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিতে পারেনি। বলেছিলাম-“তোমরা আধুনিক যুগে বাস করছ। গুজবে কান দিচ্ছ কেন?” আরো বলছিলাম-“সেতু বানাতে কি মাথার রক্ত লাগে?” উত্তরটা আমি নিজেই দিচ্ছিলাম, শিক্ষার্থীদের বলছিলাম- “সেতুতে ভালোমানের রড লাগে, সিমেন্ট, বালু, কংক্রিট লাগে। আর লাগে মানুষের মাথার ব্রেইন অর্থাত্ বুদ্ধি। আর কতক মানুষের ঘামঝরা শ্রম লাগে। সেখানে রক্ত আর মানুষের মাথার কেন প্রয়োজন হবে? শিক্ষার্থীদের বলেছি-এমন বাজে আতঙ্কে, গুজবে তোমাদের শিক্ষা থমকে যাবে! তোমরা পড়াশুনায় পিছিয়ে যাবে। যখন বুঝালাম তখন সবাই বুঝল। গুজব মানেই কিন্তু মিথ্যা রটানো। সমাজে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এ গুজব। সেখানে সত্য অসহায় হয়ে পড়ে। বর্তমানে নানা গুজবের ভয়াবহতায় সারা দেশের মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। দীর্ঘ হয়েছে নিরীহ মানুষের মৃত্যুর মিছিল আর গণপিটুনি। বাড্ডায় মেয়ের জন্য চিপস আনতে গিয়ে গণপিটুনিতে খুন হন রেনু নামের এক গৃহবধূ। নিহত রেনুর ছোট্ট মেয়ে তুবা এখনো অপেক্ষা করে মায়ের জন্য। তার মমতাময়ী মা না কী তার জন্য চিপস আনবে। সে আশায় এ ছোট্ট খুকুমনিটির অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না। গণপিটুনিতে নির্মমভাবে নিহত তুবার মা আর কখনোই ফিরে আসবে না। তুবাকে কি জবাব দেব আমরা? নারায়ণগঞ্জে বাকপ্রতিবন্ধী যুবক সিরাজকেও ওরা গণপিটুনি দিয়ে মেরেই ফেলল। প্রতিবন্ধী বলে সিরাজের বউ তার বড়ো আদুরে মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে বেশ কয়মাস আগে। প্রাণপ্রিয় মেয়েকে সিরাজ অনেক খুঁজেছে। মেয়েকে পায়নি। শেষতক খোঁজ পেল তার কলিজার টুকরো মেয়েটা নাকি নারায়ণগঞ্জে আছে। জানতে পেরেই সিরাজ আকুল হয়ে চিপস, পুতুলসহ তার মেয়েকে দেখতে নারায়ণগঞ্জে আসে। পরের ঘটনাটা খুবই ভয়ংকর! গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলল কটা অসভ্য খুনী।
রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক ক্ষেত্রে গুজব কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তার ভয়াবহ নজির সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি। আমাদের মনে আছে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত এক জামায়াত নেতাকে ‘চাঁদে দেখা যাওয়ার’ গুজব শুনে ২০১৩ সালে বগুড়া কীভাবে রক্তাক্ত ও বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছিল। তারও আগে, ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে গুজব ছড়িয়ে বৌদ্ধমন্দির ও বসতিতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। আর ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ২০১৭ সালে রংপুরে গুজব ছড়িয়ে হামলা চালানো হয়েছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে। আমরা দেখেছি, এর প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। স্বীকার করতে হবে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক অনেক অবদানও রয়েছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষতিকর সাইডও আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। যা কিনা খুনখারাবির দিকেও গড়াচ্ছে। সুতরাং সাবধান হতে হবে আমাদের!
লেখক:গবেষক
