লর্ড কার্জন

ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের সর্বশেষ মোগল!

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৪৪

বলা যায় হঠাত্ই ভারতের ভাইসরয় হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন জর্জ নাথানিয়েল কার্জন (১৮৫৯-১৯২৫), মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবথেকে সমৃদ্ধ উপনিবেশ ভারতে এর আগে এত কম বয়সে আর কেউ ভাইসরয় হননি। এ নিয়োগ তাঁকে যথেষ্ট চমকিত করলেও তিনি যে এ দায়িত্ব পালনে অপ্রস্তুত ছিলেন তা বলা যাবে না, বরং নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন তিনি। ভারতে নিয়োগ পাবার আগেও এখানে এসেছিলেন বেশ কয়েকবার। তরুণ বয়সে পারস্য, তুর্কেমেনিস্তান, সিলন, কোরিয়া, চীন, জাপান ঘুরে বেড়ান। সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে লেখা বেশ কয়েকটি বই তাঁকে ব্রিটেনের বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষক হিসেবে মর্যাদা দেয়। রাজনীতিতে তাঁর এই উত্থানের পেছনে এগুলো যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। কার্জন মোট দুই মেয়াদে ভারতের ভাইসরয়গিরি করেছিলেন, ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত। তবে, শেষের বার ক্ষমতার টানাপোড়েনে মাত্র এক বছরের মাথায় পদত্যাগ করে বিলেতে ফেরত যেতে হয়েছিল তাঁকে। বিরোধটার শুরু হয়েছিল ভারতীয় সামরিক প্রধান লর্ড কিচেনারের সঙ্গে। বিরোধ চরমে পৌঁছালে সম্মানজনক সমাধানের পথ হিসেবে কার্জন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

কার্জন জন্মেছিলেন ইংল্যান্ডের এক রক্ষণশীল পরিবারে। ইটন ও অক্সফোর্ডে পড়ালেখা শেষ করে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। ছাত্রাবস্থায় থেকেই নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে তোলেন কার্জন। বক্তা হিসেবে ছিলেন তুখোড় আর ব্যক্তি হিসেবে অনেকে তাঁকে মনে করেন অহংবোধসম্পন্ন এবং একই সঙ্গে কিছুটা বড়লোকি  মেজাজের। রক্ষণশীল বা টোরি দল থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে সরাসরি ব্রিটেনের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু এর মধ্যেই বেরিয়ে পড়েন ভ্রমণে। ভারতে ভাইসরয় হিসেবে নিয়োগ পাবার আগে বড় পদ বলতে বৈদেশিক দফতরের আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসবিদদের কাছে ভাইসরয় হিসেবে কার্জনের সাত বছর নিছকই ব্যর্থতা। আর মোটাদাগে বিশ্ববাসীর কাছে তিনি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যার মাধ্যমেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতনের সূচনা হয়েছিল। আর আমাদের কাছে বঙ্গভঙ্গকারী প্রশাসক, ম্যাকিয়েভেলিয়ান ‘ডিভাইস অ্যান্ড রুল’ নীতির বাস্তবায়নকারী। আরো কিছুটা এগিয়ে বললে বলতে হবে এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভক্তির সূচনা তাঁর হাত ধরেই হয়েছে। কিন্তু, তারপরও আরো কিছু থেকে যায়, যেখানে কার্জনকে অস্বীকার করার জো নেই। তাঁকে কেবল পুঁজিবাদী হিসেবে দেখলে মহা ভুল করা হবে। ভারতীয়দের নিয়েই ভারত শাসনের ওপর জোর দিয়েছেন বরাবর। প্রশাসনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তিনি সংস্কারের উদ্যোগ নেননি। গোটা প্রশাসন যন্ত্রের ওপরই ছুরি চালিয়েছিলেন তিনি, আমলাতন্ত্রটাকে গতিশীল করার পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজের ভিক্টোরিয়ান দর্শনের আদলে ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে ভারত পরিচালিত করার দায়িত্বটা যেন তিনি একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

ব্যক্তি কার্জন কখনো ভারতীয়দের নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে গণ্য করতেন না, যেমনটা করতেন তাঁর অনেক পূর্বসূরি। তিনি মনে করতেন ভারতীয়রা হচ্ছে অবনতিশীল সভ্যতার উত্তরাধিকার যাদের প্রয়োজন ব্রিটিশদের সহায়তা। তাঁর এই মানসিকতাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এমনকিছু উদ্যোগ নিতে যাতে কেবল ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরাই নয়, স্বগোষ্ঠীর অনেকেই ক্ষেপে উঠেছিল। পাশাপাশি ছিল তাঁর কাজের নিজস্ব ধরন। বিরোধিতাকে পাত্তা দেয়ার ধাত তাঁর মধ্যে একেবারেই ছিল না বলা চলে। সচেতন বা অসচেতনভাবে হোক রাজনৈতিক গুরু মেনেছিলেন লর্ড ডালহৌসিকে। প্রশাসনের সর্বস্তরে গতিশীলতা আনা ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। বুদ্ধিমত্তা, বোঝাপড়া ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতেন তিনি। বিতর্কেরও কম জন্ম দেননি। তবে, একথা সবাইকে স্বীকার করতেই হবে যে, প্রশাসনে এমনকিছু উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন তিনি যেখানে নিন্দুকেরাও তাঁর বিরোধিতা করতে পারবে না। তাঁর সংস্কার কর্মসূচিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কৃষি বিষয়ক সংস্কার। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা,  ত্রাণতত্পরতা, সেচব্যবস্থা পুনর্গঠন থেকে শুরু করে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্কারের মধ্যে রয়েছে ভারতে কলকারখানা ও ওয়ার্কশপ স্থাপনের পাশাপাশি ছয় হাজার মাইল নতুন রেললাইন প্রতিষ্ঠা। আর্থিক সংস্কারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লবণের ওপর ৫০ শতাংশ কর হ্রাস। সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সংস্কারের মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠা, প্রাদেশিক পুলিশের বিস্তৃতি ঘটানো এবং স্থানীয় রেজিমেন্টগুলো শক্তিশালী করা। শিক্ষা বিষয়ক সংস্কারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিজ্ঞান ও চিকিত্সা বিষয়ক পড়াশোনার ওপর গুরুত্ব প্রদান। প্রত্নতত্ত্ব রক্ষার জন্য পাশ করেন বিখ্যাত ‘অ্যানসিয়েন্ট মনুমেন্ট প্রিভারভেশন অ্যাক্ট’, গড়ে তোলেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ বিভাগ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি আরো পাকাপোক্ত ও শক্তিশালী করার ব্রত নিয়েই কাজে নেমে পড়েন লর্ড কার্জন। তিনি জানতেন শাসক হিসেবে তাঁকে কোন জায়গাগুলোতে ঠিক কোন কাজগুলো করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে পূর্বসূরিদের তুলনায় কিছুটা স্বতন্ত্র ছিলেন তিনি। এক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা অরিয়েন্টালিস্টরদের কাছাকাছি। প্রায়ই বলতেন, ‘প্রাচ্যের মানুষের ভাষার সঙ্গে আমাদের পরিচিতিই কেবল নয়, বরং তাদের প্রথা, অনুভূতি, ইতিহাস, ধর্ম, ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ এমন এক ভিত্তি রচনা করেছে যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে আমরা আমাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারব।’ আর এ কারণেই প্রশাসনকেই বেছে নেন তিনি। তাঁর মতো আর কেউ এখানে এতটা সংস্কারের প্রয়োজন বোধ করেননি। প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি, লক্ষ্য ছিল ‘অফিলাইজেশন এবং সেন্ট্রালাইজেশন।’ তবে এক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী ভূমিকার লাইনটাই বেছে নেন। অন্যদের মতামত অনেক সময় উপেক্ষা করেই নিজের ধারণাগত উপলব্ধি বাস্তবায়নের উদ্যোগী হয়েছিলেন। তবে, প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আলাদা আলাদা কমিশন গঠন করেছিলেন, কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও দ্বিধা করেননি।

প্রশাসনের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান পুলিশের ওপর নজর দেন তিনি। অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায় এ সংস্থাটি একেবারে অদক্ষ, প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিষ্পেষণমূলক। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তিনি প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং অপরাধ তদন্তে একটি কেন্দ্রীয় সংস্থাও গড়ে তোলেন, নাম দেন সেন্ট্রাল ডিপার্টমেন্ট অব ক্রিমিনাল ইনটেলিজেন্স। শিক্ষাব্যবস্থায়ও নজর পড়ে তাঁর। তাঁর উপলব্ধি ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করছে। এ কারণে প্রশাসনিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শিক্ষা সংস্কারের কাজে নেমে পড়েন তিনি। ১৯০২ সালে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এবং শিক্ষাদানপদ্ধতি আধুনিকায়নে এই কমিশন কাজ করে। কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে ১৯০৪ সালে পাশ হয় ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন। এই আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সরকারি কর্তৃত্ব আরো বৃদ্ধি পায়। সিনেটে পাশ করা আইন সরকার ইচ্ছে করলেই নাকচ করার ক্ষমতা লাভ করে। বেসরকারি কলেজের অ্যাফিলিয়েশন আরো কড়াকড়ি করা হয় এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে কলেজ পরিদর্শনের ব্যবস্থা জারি করা হয়। শিক্ষা ও গবেষণার কাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টাই ছিল এ আইনের লক্ষ্য, যেন এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তৈরির কারখানা না হয়ে দাঁড়ায়।

কার্জনের প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল আর্থিক সংস্কারও। তিনি জানতেন আর্থিক ভিত্তিটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভারতে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়বে। দুর্ভিক্ষ, ভূমি রাজস্ব, সেচব্যবস্থা, কৃষি, রেলপথ, কর ইত্যাদি বিষয়ে আইন পাশ করেন। ১৮৯৯ সালে দুর্ভিক্ষ ও খরা উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমের অংশকে আক্রান্ত করেছিল। এই পরিস্থিতিতে তিনি গঠন করেন দুর্ভিক্ষ কমিশন। এই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তিনি দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা ও ত্রাণব্যবস্থার ক্ষেত্রে বেশকিছু উদ্যোগ নেন। ভারতের সেচব্যবস্থা পুনর্গঠনে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন কার্জন। ঝিলাম খাল খননের কাজ শেষ করেন এবং সেচব্যবস্থা উন্নয়নে আরো কিছু কাজ হাতে নেন। ভারতীয় কৃষি ও পশুসম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা প্রচলনের কাজও শুরু করেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি বিষয়ক দফতর।

ভারতের বাণিজ্যব্যবস্থা আরো বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার কাজে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি নতুন দফতর, বাণিজ্য ও শিল্প দফতর। গোটা ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পস্বার্থ দেখভালের দায়িত্বে ছিল এই দফতর। এই দফতরের অধীনে ছিল ডাক ও তার, কারখানা, রেলওয়ে প্রশাসন, খনি, বন্দর ইত্যাদি। ভারতীয় মুদ্রা আইনও এ সময় পাশ হয়। কার্জন বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন রেলওয়ে ব্যবস্থার ওপর। পুরনো লাইন ঠিকঠাক করার পাশাপাশি নতুন ছয় হাজার কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেন তিনি। এ সময়ই গঠিত হয় রেলওয়ে বোর্ড। রেল প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলো তত্ত্বাবধানের জন্য এই বোর্ড গঠন করা হয়।

ভারতের বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠনেরও উদ্যোগ নেন কার্জন। কলকাতা হাইকোর্টে বিচারকের সঙ্গে তাঁদের সুযোগসুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। হাইকোর্টসহ অধীনস্থ কোর্টের বিচারক বেতন, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভারতীয় সিভিল কোডে পরিবর্তন আনেন তিনি।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই সামরিক বাহিনীকে দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। প্রথমত, বিদেশি আগ্রাসন থেকে ভারতকে রক্ষা আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। ভাইসরয় হবার পর কার্জন সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার কাজে হাত দেন যেন সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন। এ কাজে ভারতীয় বাহিনীকে দুটি কমান্ড—নর্দার্ন কমান্ড এবং সাউদার্ন কমান্ডে ভাগ করেন। ইংল্যান্ডের ক্যাম্বারলি কলেজের আদলে কোয়েটায় প্রতিষ্ঠা করা হয় অফিসারদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ স্কুল। উন্নতমানের সমরাস্ত্রও ভারতীয় বাহিনীকে সরবরাহ করা হয়।

ভারতে লর্ড রিপন স্থানীয় সরকার পরিচালনার যে দারুণ মডেলের সূচনা করে গিয়েছিলেন তার ঠিক উল্টো অবস্থান নেন কার্জন। কলকাতা করপোরেশন আইন সংশোধন করে নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব হ্রাস করার ব্যবস্থা করেন তিনি, বলা যায় করপোরেশনকে করে তোলেন ‘অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান’ হাউস। এর পেছনে কাজ করেছে তাঁর সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব, ভারতে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব স্থায়ী করা।

কার্জনের অসাধারণ এক উদ্যোগ ছিল ভারতের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘কার্জনকে সবসময়ই স্মরণ করা হবে কারণ ভারতের যা কিছু সুন্দর তা সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।’ পুরনো সৌধ সংরক্ষণে তিনি আইন পাশ করেন। পাশাপাশি এই দফতরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহও নিশ্চিত করেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন ভারতের প্রত্নসম্পদ ছিল কেবল ইউরোপীয় পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগের ফলে বিদেশিদের পাশাপাশি ভারতীয়রাও এই উদ্যোগে যুক্ত হবার সুযোগ লাভ করে। ভারতের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের এই উদ্যোগের কারণেই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ কার্জনকে মনে রাখবে।

অনেকে বলে থাকেন বাংলা ভাগই ছিল কার্জনের জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। আর এটাই ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট। বিহার, উড়িষ্যা ও বাংলা নিয়ে গঠিত বিশাল প্রদেশ বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্তকে কার্জন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই সাফাই গেয়ে এসেছেন। কিন্তু এটা ছিল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির বহিঃপ্রকাশ। ভাইসরয় এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাব কখনোই লুকানোর চেষ্টা করেননি তিনি। হয়তো ভেবেছিলেন কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ নিশ্চিহ্নে তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু ঘটনার ফল হয়েছিল বিপরীত। বঙ্গভঙ্গের এই সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম মনোভাব তীব্রভাবে জাগিয়ে তুলেছিল। ‘বন্দে মাতরম’-এর মাধ্যমে এই জাগরণের একটি সর্বজনীন রূপ টের পাচ্ছিল ভারতবাসী এবং কংগ্রেসের সমর্থনের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আইরিশ আদলে ‘বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ’-এর জোয়ার শুরু হয় এবং অরবিন্দ ঘোষ কংগ্রেসের মধ্যে এই শক্তির মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন। ভারতীয় জনগণের ভাগ্য ভারতীয়রাই নির্ধারণ করবেই—এ জাতীয় আওয়াজ তুলতে থাকে কংগ্রেস। অন্যদিকে ঢাকার নবাবরা অবস্থান নেয় বঙ্গভঙ্গের পক্ষে। ব্রিটিশরা এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করে এবং এ উপমহাদেশ এগিয়ে চলে বিভক্তির পথে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সেই ১৮৬৯ সাল থেকে স্যার সৈয়দ আহমেদ মুসলমানদের জন্য আলাদা প্লাটফর্ম দাবি করে আসছিলেন। বঙ্গভঙ্গের ঘটনায় তিনি বাঙালিরও নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। পরবর্তী সময়ে লর্ড মিন্টো হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনপ্রথার প্রতিশ্রুতি দেন আর সেই সঙ্গে খুলে যায় সাম্প্রদায়িকতার ‘প্যান্ডোরা বক্স’।

ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় জন্ম নেয় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। একদিকে জাতীয়তাবাদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে নাড়িয়ে দিতে শুরু করে, অন্যদিকে ভারতীয় ঐক্য বিনষ্টের সূচনা হয়। কার্জন ভারতে এসেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে। তাঁর লক্ষ্যই ছিল প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে এক অটুট ব্রিটিশ ভারত টিকিয়ে রাখা। জীবনে যা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, সেই বিষয়টি ঘটে ১৯৪৭ সালে। তাঁর সূচিত সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই ভারত ভাগ হয়।

রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে অবশেষে ১৯১১ সালে বাংলা ভাগ রদ হয় এবং ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু, কলকাতা তো অনেক অর্থেই ছিল কার্জনের শহর। তাঁর উপস্থিতি আছে ভারতীয় প্রত্নসম্পদ জরিপ অফিসে, গভর্নমেন্ট হাউসে, যেটা তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ির আদলে তৈরি করা হয়েছিল এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে, যাকে প্রায়শ বলা হয় কার্জনের তাজমহল হিসেবে। কিন্তু, তারপরও কলকাতা এক শতাব্দী আগে বাংলা বিভাগের জন্য ভাইসরয়কে ক্ষমা করতে পারেনি। জর্জ নাথানিয়েল কার্জন শেষ পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ মোগল। নিজের অজান্তেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের বীজ বপন করে গিয়েছিলেন।

তবে, বঙ্গভঙ্গের রূপকার হিসেবে পাঠ্যবইয়ে কার্জনের নাম লেখা থাকলেও ভারতের বর্তমান বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আবারও উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর নাম। কারণ, তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য শতবছর আগেই নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন। তাই একেবারে ভিন্ন দুই জন ব্যক্তি তাঁর নামে স্তুতি গাইছেন—একজন হেনরি  কিসিঞ্জার অন্যজন যশোবন্ত সিং। ভারত মহাসাগরকে ঘিরে ভারতীয় আধিপত্য বজায় রাখার প্রশ্নেই তাঁরা স্মরণ করেছেন তাঁকে, যদিও বলছেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অর্থাত্ একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের সেই ভূমিকা হবে সহযোগিতামূলক। কার্জন বেঁচে থাকলে কী বলতেন জানি না, তবে যে একটু মুচকি হাসি দিতেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ তিনি সবসময় বলতেন, তিনি যা করছেন বিচার করবে ভারতীয় উপমহাদেশ, তার জনগণ।