যুদ্ধবিরতাি সময়সীমা প্রায় শেষ। ভেস্তে গেছে দ্বিতীয় দফার বৈঠকও। আশঙ্কা ছিল ফের যুদ্ধ শুরু হবে। কিন্তু এর মধ্যেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি জানিয়েছেন, ইরান যতক্ষণ না চুক্তির জন্য কোনো প্রস্তাব দিচ্ছে, ততক্ষণ হামলা স্থগিত রাখা হলো। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের সব বন্দরে নৌ-অবরোধ আগের মতোই চলবে বলেও জানান ট্রাম্প। এর পরই ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা নাকচ করে দিয়েছেন তেহরান। দেশটি বলছে, আলোচনায় ফেরাতে হলে আগে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। ফলে পাকিস্তানে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে সেই সংকট রয়েই গেল। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাল শুক্রবারের মধ্যেই আলোচনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ল
প্রথম যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছিল গত ৮ এপ্রিল। দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপরে কোনো হামলা করা হবে না বলে জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এর মধ্যে চুক্তি না করলে ফের বোমাবর্ষণ শুরু হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকাল) সেই সময়সীমা শেষ হয়। এর আগেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ইরানের নেতাদের কোর্টে বল ঠেলে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের কথায়, ‘ইরানের নেতারা দ্বিধাবিভক্ত। ইরান সরকারের মধ্যেও বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে। তবে এটা নতুন কিছু নয়।’ তবে এবার কোনো সময়সীমা বেঁধে দেনননি তিনি। ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের নেতা এবং প্রতিনিধিরা যেন একসুরে আমাদের সামনে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। এটাই শর্ত। ততদিন পর্যন্ত আমরা হামলা করব না।’ তবে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও আমেরিকান সেনাকে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রথম দফার শান্তি বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পরই ইরানের সব বন্দরে অবরোধ করে আমেরিকা। বন্ধ করে দেওয়া হয় হরমুজ।
এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার মধ্যরাতে ইরানের আট জন ব্যক্তি, চারটি সংস্থা এবং দুটি বিমানের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। যে আট ব্যক্তির ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তারা বর্তমানে ইরান, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন। বিমান ও সংস্থাগুলো মূলত তুরস্কের। এই প্রসঙ্গে মাকিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানকে কারা সাহায্য করছে, তা খুঁজে বের করা হবে। তিনি বলেছেন, কেউ ছাড় পাবে না। ইরান কোথা থেকে টাকা পাচ্ছে, কারা অস্ত্র সাহায্য করছে, সব খুঁজে বের করা হবে।’ উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের পর ইরানের ওপরে এই নিয়ে পঞ্চম দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র।
বৈঠক নিয়ে সংকট কাটছে না
প্রথম বার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গত ১২ এপ্রিল শান্তি বৈঠকে বসেছিল মার্কিন ও ইরানের প্রতিনিধিদল। উদ্দেশ্য ছিল, যেভাবে হোক সংঘর্ষ থামিয়ে একটি শান্তিচুক্তি করা। কিন্তু প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা চললেও নিষ্ফলাই শেষ হয় সেই বৈঠক। এর পরই ইরানের সব বন্দর অবরোধ করেন আমেরিকান সেনা। শুধু তা-ই নয়, ইরানের পতাকাবাহী একটি জাহাজও বাজেয়াপ্ত করা হয়। এতে উত্তেজনা আরো বাড়ে। এর মধ্যেই ইরানকে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসার আহ্বান জানান ট্রাম্প। কিন্তু ইরান রাজি হয়নি। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, একদিকে হুমকি অন্যদিকে, আলোচনা চলতে পারে না। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। তবে ইরান তার এই ঘোষণাকে নাকচ করে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর কথা ঘোষণা করার পরও হামলায় ইতি টানেনি ইরান। হরমুজে তিনটি জাহাজে হামলা, এর দুটিকে জব্দ করা হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে যে তিনটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, তা করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত ফার্স নিউজ এজেন্সি বলছে, ইউফোরিয়া নামের একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং সেটি এখন ইরানের উপকূলের কাছে আটকে আছে। ইরানি গণমাধ্যমের খবরে আরো বলা হয়েছে, এমএসসি ফ্রানচেস্কা ও এপামিনোন্দাস নামের দুটি জাহাজকে জব্দ করা হয়েছে এবং সেগুলোকে এখন ইরানের উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, ‘পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির আহ্বানের পর ইরান তাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর সতর্কভাবে নজর রাখছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা আছে কিনা, সে প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হলো কূটনীতি। যখনই আমরা মনে করব যে, কূটনীতি প্রয়োগের প্রয়োজন আছে এবং তার জন্য যথোপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তখন আমরা পদক্ষেপ নেব।’ দেশটি জানিয়েছে, আলোচনায় আনতে হলে মার্কিন নৌ-অবরোধ আগে প্রত্যাহার করতে হবে।
বৈঠক নিয়ে সংকট থাকলেও আশার কথা শুনিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নিউ ইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছেন ট্রাম্প। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদের সূত্রগুলো তাদের জানিয়েছে, ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শুরু হতে পারে। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাইলে তিনি জবাব দিয়েছেন, সম্ভাবনা আছে।

