গত সংখ্যার পর
৫.
তিরিশের পাঁচজন কবির মধ্যে একমাত্র সুধীন্দ্রনাথ দত্ত৩ ছাড়া বাকি চারজন কবিই কোনো না কোনোভাবে পরবর্তী কবি-গোষ্ঠীকে, বিশেষত পঞ্চাশের ও ষাটের দশকের কবিদের প্রভাবিত কিংবা শিল্পগুণে প্ররোচিত করেছিলেন। আবুল হোসেনের কবিতায় অমিয় চক্রবর্তীর নাটকীয়তা ও উক্তির সংযম এবং সে-সঙ্গে বিষ্ণু দে-র নাগরিক বৈদগ্ধ্য; ষাটের আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতায় বুদ্ধদেব বসুর প্রথম জীবনের কবিতার রোমান্টিক উচ্ছ্বাসের বল্গাহীন আনন্দ (তবে মান্নান সৈয়দ, পরাবাস্তব কবিতায় দীক্ষিত হওয়ার পরে, অবচেতনার ভিন্ন মনষ্ক্রিয়া আমরা লক্ষ করেছি) নরেশ গুহ কিংবা অরুণকুমার সরকার (যদিও এরা চল্লিশের কবি) বুদ্ধদেব বসুকে বাদ দিয়ে এগোতে পারেননি— এ-সবই আমার যুক্তিকে শক্ত করবে।
তবে সম্ভবত জীবনানন্দ দাশই তাঁর পরবর্তী কয়েক দশকের কবিদের সবচেয়ে বেশি আচ্ছন্ন, আলোকিত, রক্তাক্ত ও আবিষ্ট ক’রে রেখেছেন।৪ এ-সময়ের প্রধান কবি ব’লে বহুল স্বীকৃত শামসুর রাহমানেরও শুরু হয়েছিলো জীবনানন্দীয় ধূসরতা ও বেদনা অবগাহনের মধ্যে দিয়ে। প্রথম যুগের ভাষা প্রয়োগ, উপমা, চিত্রকল্প, প্রকৃতি, বস্তুর উল্লেখ, গন্ধ; সবই এক কথায় নিঃসংশয় রূপে জীবনানন্দীয় জগতের কাছাকাছি। শামসুর রাহমানের মহত্ত্ব যে, তা তিনি লুকোনোর চেষ্টাও করেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষ্ণু দে, আংশিক সুধীন্দ্রনাথের জগত্ শোষণ সমাপ্ত ক’রে এখন সম্কূর্ণরূপেই এক স্বাধীন, বহু বিস্তৃত ও প্রবলভাবে তাঁর ব্যক্তিত্বে রঞ্জিত এক ভিন্ন পৃথিবী রচনা করেছেন, যা একালের বহু তরুণ কবিকে সূক্ষ্মভাবে হ’লেও প্রভাবিত কিংবা আন্দোলিত করে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এক মৌখিক সাক্ষাত্কার৪ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল—তা থেকে অনুমান করা সহজ যে শক্তি নিজস্ব শ্রীবৃদ্ধির চিন্তায় জীবনানন্দকেই সবচেয়ে বিত্তবান, ভাস্বর কবি ব’লে চিহ্নিত করেছিলেন। জীবনানন্দের বলয়ের কবি স্কষ্ট ও অস্বচ্ছভাবে আরও আছেন; বিনয় মজুমদার, উত্পলকুমার বসু, আল মাহমুদ—এরা কেউ কেউ সমগ্রভাবে, কেউ আংশিকভাবে হ’লেও জীবনানন্দের কাছে ঋণী।
তিরিশের কবিদের কাছে এই ঋণ৫ শুনতে পাই সাম্ক্রতিককালের কোনো কোনো কবির কাছে, অত্যন্ত তিক্ত ও বাংলা কবিতার জন্যে ক্ষতিকর ব’লে মনে হচ্ছে। পূর্বসূরিদের দ্বারা সংক্রমিত (প্রাথমিক পর্যায়ে) হওয়া এক কথা, আর তাঁদের অনুকরণ ভিন্ন ব্যাপার।
তবে আগেই বলেছি, জীবনানন্দের ইতিহাসবোধ, শ্রেয় ধারণা, বিশ্ব নাগরিকের সচেতন চিন্তা, শক্তি’র ছিল না। জীবনানন্দের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক ছিল মালয় সাগর থেকে টায়ার বন্দরে পরিভ্রমণ। ব্যাবিলন, গ্রীস, ভারত, আফ্রিকা একই নিঃশ্বাসে সময়-জয়ী চেতনায় খুব অনায়াসে উচ্চারিত হয়েছে। জীবনানন্দই বলতে পারেন ‘ডানে বাঁয়ে ওপরে নিচে সময়ের/জ্বলন্ত তিমিরের ভিতর তোমাকে পেয়েছি’। জীবনানন্দের ঈশ্বর প্রচলিত ঈশ্বর নয়, শ্রেয়বোধের ঈশ্বর, পৃথিবীর জন্যে পরম শুশ্রূষার জন্যে ঈশ্বর। তাই শ্বেতাশ্বতর যম নচিকেতা, বুদ্ধদেব ও ঈশার উচ্চারণ দেখি একই অনুসন্ধানের মধ্যে—কেননা আমাদের পৃথিবীর আদিম উষাপুরুষেরা, এক মহত্ সত্য ও বিশ্বাস আবিষ্কারের জন্যেই উদ্বুদ্ধ করেন, যার জোরে জীবনানন্দও বলতে পারেন, ‘আমাদের মৃত্যু হয়ে গেলে এই অনিমেষ আলোর বলয়/মানবীয় সময়কে হূদয়ে সফলকাম সত্য হতে ব’লে/জেগে রবে; জয়, আলো সহিষ্ণুতা স্থিরতার জয়’।
কিন্তু শক্তির দৃষ্টি বাংলার বাইরে যেতে কদাচিত্ই প্রস্তুত। পদ্মপাতা, দিঘি, চাঁদ, খড়, নদী, বটফল, মহুয়া, ভাত, গুল্ম, লতাপাতা, শালবন, পাহাড়, জঙ্গল, পাথর, সিংহদরজা, মুথাঘাস, হাঁড়ি, বৃষ্টি, ডোবা, আঁতুড়ঘর, বালি, মজাকুয়া—অর্থাত্ আমাদের শ্রীহীন জীবনের দৈন্যদশায় একান্তভাবে যা জড়াজড়ি করে আছে, শক্তি তারই উল্লেখ করেছেন। আর বারবারই কলকাতা; যে-কলকাতা আমৃত্যু আপন করার জন্যে তার প্রাণান্ত চেষ্টা আমরা লক্ষ করেছি। অবশ্য মিলের খাতিরে বেদুইন, উট, হার্টক্রেন, ওসামো দাজাই এসব শব্দ কবিতার শরীরে এসেছে; কিন্তু শক্তির সারা শরীরেই ‘গাঁ-গেরাম-গেরস্থালী, পানা পুকুর, শ্যাওলা-দাম, হরিণমারির চর—’ এমনকি নিজের বিচ্যুত সত্তাকে ঠাট্টা, শ্লেষ করার জন্যে, গ্রাম্য, হাল্কা দেশজ ও অশ্লীল শব্দ যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন নির্বিকার চিত্তে। শক্তি ছাড়া অন্যদের পক্ষে যা ছিল অকল্পনীয়। কয়েকটি উদ্ধৃতি এখানে দেয়া অসঙ্গত হবে না—
ক. যোনির মাঢ়ির খিল হাট-করা বেহায়া পাংশুতা
খ. উলঙ্গ কিশোরী তোমার মাই দুটো সন্ন্যাসেই মস্ত হেন্ করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা!
গ. আখাম্বা গতর কেড়ে নিয়েছিলো আদি পুরস্কার
ঘ. কিছু একটা করে ওই কবিত্বের সঙ্গে মিলেমিশে
হাত মারে, হেগে যায়—রঙিন পিচকারি কিনে ভরে
ভাষার সাবান জল তারপর ছড়ায় ছিটোয় বিভিন্ন কাগজে...
বাংলা কবিতায় শক্তি এ-ভাবেই সৃষ্টি করেছেন এক শ্বাসরোধী জগত্। শত শত কবিতা, মসৃণআবার উঁচু-নিচু, বল্গাহীন কল্পনায় যুক্তিহীনতায় চূড়ান্ত, কখনো কখনো খণ্ড এমনকি অপূর্ণ মনে হতে পারে—অবচেতন ও চেতনার মিশ্রণে অতি সম্মোহনকরা কবিতা; মাঝে মাঝে এত অস্কষ্ট যে বিশ্লেষণ করাও অসম্ভব; এক নিশ্বাসে লেখা অদল-বদলের সময় পর্যন্ত নেই (শক্তি নিজেই বলেছেন, তিনি কবিতার পরিমার্জনায় বিশ্বাস করেন না), কিন্তু প্রথম পঙিক্ত থেকেই বলে দেয় এ কবিতা শক্তিরই কবিতা—তার ছাড়া আর কারোরই নয়। এতই নিজস্ব শব্দ, নিজস্ব বাক্ভঙ্গী, নিজস্ব অভিজ্ঞতা—সর্বোপরি নিজস্ব উন্মাদনা তাতে চিত্রিত।
৬.
কাব্য-জীবনের বিশেষ-বিশেষ সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘ কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আসলেই সে-গুলি খণ্ড কবিতার দীর্ঘ মিলনক্ষেত্র ছাড়া কিছু নয়। তাঁর স্বভাবে স্থিতধী চিত্তের অটল অধ্যবসায় ছিল না, সম্ভবত জীবনানন্দের প্রেরণায় সে-সব কবিতার জন্ম ও ব্যর্থতা। কিন্তু খণ্ড কবিতার লিরিক দ্যুতি, আপাত এলোমেলো শব্দ স্থাপন, ইচ্ছাকৃত নৈরাজ্য, উন্মাদনার বাউল-ভঙ্গী; সবই এক সঙ্গে শক্তিকে পৌঁছে দেয় আলাদা চেহারায়। ‘তোমার আলোই তোমায় মধুর করেছিলো একা’ অন্ধকার শালবন কবিতার এই মুগ্ধতা শেষ হয় ‘কেউ কি জাগালে শালবন, বাহুবন্ধন চারিধারে?—’ এই প্রশ্নের অকপট আন্দোলন দিয়ে।
সুধীন্দ্রনাথ বলেছেন : ‘আমার আনন্দ বাক্যে’। শক্তি, সম্ভবত বলতেন, ‘আমার আনন্দ বাক্যের অভ্যাসকে বদলে দিতে’। ‘ছায়ামারীচের বনে’ কবিতায় বহুদূরে কালোজল কুয়োতলায় আছে বলেই উটকে আহ্বান করেন এই বলে ‘হে উট, গভীর উট নাচো ঘুরে-ঘুরে।’ বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়, শক্তি তাকে চূড়ান্তে পৌঁছে না দিয়ে ছাড়েন কী করে? তাইতো ‘বলি, বড়মিঁয়া, যাবো সে কমলাপুলি/নিশানা কী তার’? চাঁদ ছিল চাঁদে লেগে। ‘মনে পড়লো’, ‘অবনী বাড়ি আছো’, ‘চাবি’, ‘আমি স্বেচ্ছচারী’ প্রথম দিকের এই কবিতাগুলির তীক্ষতা মোটেও ম্লান হয়নি মধ্যজীবনের কবিতা ‘কার জন্যে এসেছেন?’, ‘যে ভাবে যায়, সক্কলে যায়’, ‘ভিক্ষাই মনীষা’, ‘সব হবে’ এ-সব অভিজ্ঞতায় পৌঁছায়।
একজন কবির কাছে আমরা কী চাই?—এই প্রশ্নের উত্তরে এক-একজন তার নিজের অভিজ্ঞতা, অর্জিত মনীষা, উপলব্ধির ক্ষমতা, রুচির পক্ষপাত থেকেই যে দেবেন; এতে কোনোই সন্দেহ নেই। অডেনের কবিতা যার ভালো লাগে, ম্যালার্মের কবিতা তার ভালো না লাগাই স্বাভাবিক; সুধীন্দ্রনাথের পাঠকও কি সে-রকম আনন্দ খুঁজে পাবেন অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায়? জীবনানন্দের সময়-চিন্তা, বৃহত্ ও শাশ্বত সময়ের চিন্তা। শক্তির যদি তা নিছকই সাম্ক্রতিক জীবন নিয়ে আলোড়িত হয়; আমি অন্তত সেক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ তুলব না। তাঁর শেষ দিকের ভাবনা এই ভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে :
চাঁদের আলো
ভালো—
না বাসার অর্থ—কাঠিন্য
সবার জন্য
শ্মশানের দরজাটাই খোলা
ধানের গোলা
ছাই
দিগন্তে বাজখাঁই
চাঁদের আলো
ভালো
ওটুকুর জন্যেই বেঁচে আছি।।
(বেঁচে আছি/প্র.স্ব)
৭.
অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এক-একজন কবি একটি কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে দু-টি ছন্দের ওপর বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কবির বিশ্বাস, তাঁর বলবার কথা, তাঁর বিশেষ অভিজ্ঞতার পরিধি, তাঁর ভেতরের চাপ ও প্রতিভা একটি ছন্দের ওপর বিশেষ ক্ষমতা ও অধিকার দেয়। জীবনানন্দ দাশকে আমরা বলতে পারি বিশেষভাবে অক্ষরবৃত্তের কবি। মাত্রাবৃত্ত কিংবা দু-একটি স্বরবৃত্তের কবিতা যে নেই; তা নয়। কিন্তু জীবনানন্দের অন্তঃপ্রেরণা আত্মপ্রকাশের তাগিদ যখনই পেয়েছে—তখনই দেখেছি অক্ষরবৃত্ত ও মুক্ত-অক্ষরবৃত্তেই তাঁর প্রকাশের উল্লাস। অথচ এই কবিই বাংলা কবিতার ভবিষ্যত্ মুক্তির সম্ভাবনায়, স্বরবৃত্ত বা ছড়ার ছন্দকেই আদর্শ বলে অনুভব করেছিলেন।
অপ্রাসঙ্গিক হয়তো হ’বে কিন্তু আরও কয়েকজন কবির বিশেষ ছন্দ-প্রীতির উল্লেখ করা যায়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উজ্জ্বলতা অক্ষরবৃত্ত ও মুক্তক-অক্ষরবৃত্ত ছন্দেই; বিষ্ণু দে মাত্রাবৃত্তের মতো সেকেলে ধ্বনির ছন্দকে একালের পোশাকে উপস্থিত করার যে অভূতপূর্ব ও লক্ষণীয় কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন, এটা বাংলা কবিতার পাঠকদের সম্ভবত এখন আর জানাতে বাকি নেই। আর বুদ্ধদেব বসু? তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তে আমার ধারণায় সমানসমান। অমিয় চক্রবর্তী যেমন ছন্দের ব্যাকরণ মেনেছেন, তেমনি ছন্দের ওপর তাঁর শক্তির কথা ভুলে গিয়ে জোর জবরদস্তিও কম করেননি। উত্তর জীবনে নরেশ গুহ-কে চিঠিতে সেই ‘অন্যায় কর্মের’ মনস্তাপটিও নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করেছিলেন। এবং শামসুর রাহমান—মাত্রাবৃত্তের কবিতায় তাঁর স্বাভাবিক কৃতিত্ব দেখালেও অক্ষরবৃত্ত ও মুক্তক-অক্ষরবৃত্তেই তাঁর প্রতিভার স্ফূরণ ঈর্ষণীয় ক্ষমতার দৃষ্টান্ত হ’য়ে থাকবে।
স্বরবৃত্তের উদ্দীপনায় সবচেয়ে বেশি মেতে ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। (তাঁর আদর্শের কবি জীবনানন্দের প্ররোচনায়, না নিজেরই ভেতরকার অস্থিরতার তাগিদে?) আলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের স্বরবৃত্তের যে গাম্ভীর্য ও পরীক্ষাপ্রবণতা দেখেছি; শক্তির ক্ষেত্রে তেমনটা না হ’লেও তাঁর স্বরবৃত্তের আলাদা চঞ্চলতার রূপটি পরবর্তী কবিদের উদ্বুদ্ধ ও দিক্দর্শনের কাজ করবে। ইতিমধ্যে যে তা করেনি, তা নয়। অনেক তরুণ কবির, বিশেষত, পশ্চিম বাংলার তরুণ কবিদের ওপর তাঁর প্রভাব অপ্রতিরোধ্য।
শক্তি ও স্বরবৃত্ত ছন্দ অবিভাজ্য, এটা মনে হ’লে কারো পক্ষেই অভিযুক্ত হবার ভয় নেই। তাঁর দ্বিতীয় স্বাচ্ছন্দ্যের ছন্দ হ’চ্ছে অক্ষরবৃত্ত। বিশেষত চতুর্দশপদী কবিতাগুচ্ছের কথা ভাবলে তা মানতেই হ’বে। শক্তি গদ্য কবিতাও লিখেছিলেন, কিন্তু তার প্রতি তেমন মমতা ছিল ব’লে মনে হয় না। বছর কয়েক আগে ‘এতো কবি কেন’? সাম্ক্রতিক তরুণ কবিদের ওপর তাঁর বিতৃষ্ণার কথা অকপটে লিখে জানিয়েছিলেন। একালের অধিকাংশ তরুণ কবি ছন্দ না জেনেই কবিতা লেখে, গদ্য কবিতাই যে তাঁদের আত্মপ্রকাশের বাহন; কিংবা ছন্দে লিখতে যে ধৈর্য, শ্রম, সংযম ও সংকল্পের প্রয়োজন সেসব পরিত্যাগ করেই যে তাঁদের আত্মপ্রকাশের ঝোঁক—এটা শক্তির কাছে অসহ্য ছিল।
এ-কথা সত্য যে শক্তির কবিতায় পুরাণ, মিথ, কিংবা চিন্তায় পশ্চিমের প্রত্যক্ষ প্রতিধ্বনি নেই—যদিও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঝুলিতে অনেক অনুবাদ গ্রন্থের খবর আমাদের অজানা নয়। কিন্তু শামসুর রাহমানের কবিতায় যেমন ইকারুস; ইলেকট্রা, টেলেমেকাস, স্যামসন এ-সব চরিত্র নায়ক কিংবা প্রধান চরিত্র হিসেবে আসে—কিংবা পশ্চিমের উপন্যাস বা গল্পের ইঙ্গিতময় উল্লেখ, বিশেষ কবির; প্রধানত ক্লাসিক কবিদের লেখার বা বক্তব্যের বিপরীত বক্তব্যকে স্কষ্ট করে—এমন বিশ্ব নাগরিকতা শক্তির কবিতায় নেই। শক্তির কবিতায় আছে নারী, প্রকৃতি ও মৃত্যুচিন্তা। (মৃত মানুষদের উদ্দেশে লেখা শক্তির এলিজিগুলি সব সময়ই অনবদ্য)। জীবনানন্দের নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত; কিন্তু শক্তির নারীরা ভিড়ে ও জীবনের ব্যস্ততায় অনেক দূরের—মাঝে মাঝে দেখা হয় বটে, কিন্তু তার চুল, বুক, ঠোঁট এমন কী প্রেমের উচ্চারণ সুদ্ধ ধূসর। প্রকৃতির সামনেই শক্তির আনন্দ সবচেয়ে সোচ্চার। এবং সে সঙ্গে ঈশ্বরের চিন্তা তাঁর সব সময়ই প্রখর কিংবা জাগ্রত।
৮.
বাংলা কবিতার একটি বিশেষ রূপকে একাই প্রচণ্ড প্রতাপের সঙ্গে ধারণ করে কয়েকটি দশক দাঁড়িয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। মুখের কথার কাছাকাছি এনেছিলেন কবিতার ভাষাকে; সাধু-চলতির মিশ্রণ ঘটিয়ে, গ্রাম্য, দেশজ, অশ্লীল, আপাত অর্থহীন, উন্মাদ ও উন্মত্ত; সমস্ত কিছুই কবিতার অন্তঃপুরে পুরে দিয়েছিলেন। বলতেন বটে, পরিমার্জনায় তিনি বিশ্বাস করেন না; কিন্তু অজস্র ও অপরিমেয় শব্দ ছিল তাঁর সঞ্চয়ে—এমন সব অভাবিত শব্দ বসাতেন আমাদের অভ্যাসের বিপরীতে যে, মুহূর্তমধ্যেই আমাদের অবশ ও মুগ্ধ করে রাখত তাঁর দক্ষতা ও দৈব-পাওয়া কোনো কোনো ধ্বনি। তাঁর কবিতা প্রবচনের মতো ঘুরেছে তরুণদের মুখে। শঙ্ঘ ঘোষ যে বলেন, ‘মরমিয়া আবেগের চোরাটানে তাঁর কবিতা টেনে নিতে পারে সাধারণ মানুষকে’ এবং ‘দৈনন্দিন চিরন্তনের কাছে’ পৌঁছে দিতে পারে, কথাটা আশা করি শক্তির কবিতার পাঠকমাত্রই এখন প্রবলভাবে সমর্থন করবেন।
প্রথমজীবনের বিশৃঙ্খল ও বিদ্রোহী জীবন-যাপন; কিন্তু পরবর্তীতে নানা স্মরণীয় ও উদ্ভট কর্মকাণ্ডের ফাঁকে ফাঁকে নিরলস ও নিরবিচ্ছিন্ন কাব্যচর্চা (তাঁর ভাষায় পদ্যচর্চা) তাঁকে পৌঁছে দিলো এমন এক মর্যাদায়, কিংবদন্তীর নায়কদেরই যা প্রাপ্য। তাঁর কবিতা বিপুল বললেও কম বলা হবে—যদিও কয়েক বছরের কবিতায় পূর্বের সেই ধার ছিল না; ক্ষ’য়ে গিয়েছিল চিন্তা ও শব্দের ধার—তার থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে বাছাই করলেও যা দাঁড়াবে, তার সংখ্যাও আমাদের অনেকের ধারণার বাইরে। পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান ছাড়া এত বিশাল কবিতার ভালোবাসা নিয়ে সম্ভবত আর কেউ আসেননি। এই প্রেম যে প্রতিভা থেকেই জন্ম নেয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই—আমার ধারণা অত্যন্ত প্রতিভাবান কবি হিসেবেই সময় তাঁকে আরও অনেককাল কবিতার বরপুত্র হিসেবে স্মরণে রাখবে।
