‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’ ও পোস্ট নিও-রিয়ালিজম ইতালিয়ান সিনেমার [ফেদেরিকো ফেল্লিনি, মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি, পিয়ের পাওলো পাসোলিনি প্রমুখ নির্মিত] পাশাপাশি ‘চেক নিউ ওয়েভ’ও সম্ভবত বিংশ শতকের সিনেমার অন্যতম ঋদ্ধ একটি আন্দোলন।
১৯৬০ দশকের শুরু থেকে ১৯৭০ দশকের শুরু পর্যন্ত প্রায় দশ বছরে চেক ফিল্মমেকারদের একটি প্রজন্ম আমাদেরকে সিনেমার সামগ্রিক ইতিহাসের কিছু সর্বোত্কৃষ্ট সুনিপুণ, মৌলিক, একেবারেই উদ্ভাবনাময় এবং অসম্ভব সুন্দর সিনেমা উপহার দিয়েছেন। আর এ আন্দোলন ভেঙে পড়েছে দেশটিতে ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হয়ে যাওয়া একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের ফলে। এ সময়টিতে ‘চেক নিউ ওয়েভ’-এর ফিল্মমেকারেরা রাষ্ট্রসমর্থিত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সুযোগ-সুবিধা এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের [বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে] মনোযোগ আর প্রাসঙ্গিক শৈল্পিক স্বাধীনতাকে বেশ উপভোগ করতে পেরেছেন।
কয়েক বছর তাঁরা এমনসব বিষয়বস্তু নিয়ে ফিল্ম বানিয়েছেন, যেগুলোকে অন্য কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সেন্সরবোর্ডের পক্ষে হজম করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ‘যে উত্পীড়ক ও অযোগ্য সিস্টেমের বর্বরতার শিকার তারা সবাই, সেইসব বিষয়আশয় সম্পর্কে চেক জনগণকে সামগ্রিকভাবে সজাগ করা’। ১৯৬৮ সালের গ্রীষ্মে সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার এবং স্তালিনের শাসনকাল পর্যন্ত প্রচণ্ড শক্তিমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপের পর ‘নিউ ওয়েভ’-এর অফিসিয়ালি পরিসমাপ্তি ঘটে।
ফিল্মমেকার ভেরা চৈতিলোভার সবচেয়ে ‘বিখ্যাত’ সিনেমা ‘ডেইজিস’-এর [১৯৬৬] কাহিনি দুটি মেয়েকে ঘিরে—যারা উপলব্ধি করতে পারে, তারা নিজেরাসহ তাদের চারপাশের সবকিছুই দুর্নীতিগ্রস্ত; ফলে ধ্বংসযজ্ঞ ও দুর্নীতির একটি উন্মাতাল পর্যায়ে তারা পৌঁছে যায়—যা কিনা ফিল্ম ন্যারেটিভ ও মন্তাজের টেকনিক সহকারে ফিকশনের সব ধরনের বেসিক নিয়মনীতিকেই একেবারে ভেঙে দিয়েছে : এখানে এই দুই নায়িকার উন্মাতাল যাত্রাকে অনুসরণ করতে করতে আমরা রঙিন দৃশ্য থেকে একলাফে চলে যাই সাদা-কালো দৃশ্যে, আবার সাদা-কালো থেকে লালচে আভাময়তায়, আবার সেখান থেকে একেবারেই যোগসাজসহীন কোনো দৃশ্যে। ফিল্মটিকে একই বছর নির্মিত ‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’ ফিল্মমেকার জ্যঁ-লুক গদারের ‘টু অর থ্রি থিংস আই নো অ্যাবাউট হার’-এ দেখা মেলে কলেজ-ধরনের মন্তাজের চেয়েও বেশি ক্যারিশমার দেখা পাই আমরা। চৈতিলোভা সম্ভবত চেক ফিল্মমেকারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৌলিক; আর তার বাস্তবিক প্রমাণ তিনি আরও একবার রেখেছেন তাঁর ‘ফ্রুট অব প্যারাডাইস’ [১৯৭০] ফিল্মে। তিনি আরও বেশকিছু ফিল্ম বানালেও ‘দ্য অ্যাপল গেম’ [১৯৭৮], ‘প্যানেলস্টোরি’ [১৯৭৯] ও ‘দ্য জেস্টার অ্যান্ড দ্য কুইন’ [১৯৮৮] ছাড়া বাকিগুলো তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি।
অনেকের চোখেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফিল্মগুলোর একটি হলো জারোমিল জায়ার্সের ‘ভ্যালেরি অ্যান্ড হার উইক অব ওয়ান্ডারস’ [১৯৭০]। ভিতেস্লাভ নেভালের লেখা একটি চেক পরাবাস্তব উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ফিল্মটিতেও বেশিরভাগ ভালো সিনেমার মতোই মনোনিবেশ ধরে রাখা সাধারণ দর্শকের জন্য বেশ দুরূহ; তবে মনোমুগ্ধকর ফটোগ্রাফি ও মিউজিকের সন্নিবেশে একটি পরাবাস্তব রূপকথাকে ফ্যান্টাসি ও হররের সীমানায় বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গেই হাজির করতে পেরেছেন এই ফিল্মমেকার। ফিল্মটির নাম দেখে এটিকে পূর্বানুমান করে বসা দর্শকদের অনুমানকে এর প্লটের প্রকাশভঙ্গি একেবারেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জারোমিল জায়ার্সের বানানো অন্য ফিল্মগুলোর মধ্যে ‘দ্য জোক’ [১৯৬৯] ও ‘আই উইল গিভ মাই লাভ টু দ্য স্যালোস’ [১৯৭১] বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
জ্যান নেমেকের ফিল্মগুলোর মধ্যে ‘দ্য পার্টি অ্যান্ড দ্য গেস্টস’ [১৯৬৬] সবচেয়ে সহজলভ্য। সরকারি ক্ষমতা প্রসঙ্গে নির্মিত এই সিনেমা ভীষণ চাপা উত্তেজনার আবহ ও ডার্ক হিউমারে ভরা। একদল লোককে বনের মাঝখানে এক পিকনিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ‘হারাম’ খাবার খাওয়ার জন্য, অথচ তারা ‘না’ বলতে পারেনি। ফিল্মটি চেকোস্লোভাকিয়ায় ‘চিরকালের জন্য নিষিদ্ধ’ হয়েছিল। নেমেক নির্মিত অন্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘ডায়মন্ডস অব দ্য নাইট’ [১৯৬৪] আর ‘লেট নাইট টকস উইথ মাদার’ [২০০১] ছাড়া অন্যগুলো তেমন আবেদন রাখতে পারেনি। বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়ার পথে ট্রেন থেকে পালানো দুই ইহুদি বালককে নিয়ে ‘ডায়মন্ডস অব দ্য নাইট’ নামের অসাধারণ সিনেমাটির কাহিনি। থিমটি ভেবে প্রিয় পাঠক, আপনি যা অনুমান করছেন, এটি আদতে তারচেয়ে দূরবর্তী বিষয় হয়ে উঠেছে; অরণ্যের ভেতর দিয়ে, তারপর যুদ্ধ কিংবা নািসদের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এ দুই বালকের স্বপ্ন, কল্পনা আর হ্যালুসিন্যাশনকে নিয়ে ক্যারিশমা দেখিয়েছে এই সিনেমা। নেমেকের আরেকটি সহজলভ্য ফিল্ম ‘লেট নাইট টকস উইথ মাদার’ তিনি বানিয়েছেন ডিজিটাল ভিডিওতে, একটি ফিশারি লেন্স ব্যবহার করে; তাঁর ক্যামেরার মুভমেন্টের মাধ্যমে যেসব বিমূর্ত ইমেজের সৃষ্টি তিনি করেছেন, তা সিনেমার এর আগে কেউ দেখেনি কখনো। এটি একেবারেই ব্যক্তিগত একটি ফিল্ম; একধরনের ডকুমেন্টারি কিংবা বলা চলে, তাঁর মায়ের মৃত্যু নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক সিনেমা। এখানে বেশ চমকপ্রদ এক্সপেরিমেন্টের দেখা মিললেও এটি আসলে চেক সিনেমার কিংবা জ্যান নেমেকের সিনেমার পরিচয়দানের ক্ষেত্রে কোনো সেরা কাজ বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য নয়।
এই বেলা এসে আমাদের উচিত ইস্টার ক্রুমবাচোভাকে নিয়ে কথা বলা। তিনি ছিলেন জ্যান নেমেকের স্ত্রী; ছিলেন ‘ডায়মন্ডস অব দ্য নাইট’, ‘দ্য পার্টি অ্যান্ড দ্য গেস্টস’, ‘ডেইজিস’ ও ‘ফ্রুট অব প্যারাডাইস’-এর কস্টিউম ডিজাইনার ও কো-রাইটার; ছিলেন ‘ভ্যালেরি অ্যান্ড হার উইক অব ওয়ান্ডারস’-এর প্রোডাকশন ডিজাইনার ও কো-রাইটার; আরও ছিলেন ‘দ্য ইয়ার’ [১৯৭০] সহ আরও অনেক খ্যাত-অখ্যাত সিনেমার ডেকোরেটর। ‘চেক নিউ ওয়েভ’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিল্মমেকারদের অনেকের সঙ্গে এবং সেই সময়ের সেরা ফিল্মগুলোর বেশিরভাগগুলোতেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন তিনি।
কারেল কাচিনার সবচেয়ে বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য ইয়ার’। ফিল্মটিকে সঙ্গে সঙ্গেই নিষিদ্ধ করেছিল চেক কর্তৃপক্ষ; আর তা বহাল ছিল টানা ২০ বছর। নিপীড়ক টোটালিটারিয়ান সিস্টেমের অধীনে প্যারানোইয়াগ্রস্ত সাবজেক্ট নিয়ে এটি একটি মাস্টারপিস সিনেমা। নিজেদের বাড়ি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া টের পেয়ে এক দম্পতির জীবন ভেঙে পড়ে এবং তাদের বলার মতো কথাগুলো নিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
সেই প্রজন্মের চেক ফিল্মমেকারদের মধ্যে আরেকজন মৌলিক নির্মাতা হলেন জুরাজ হার্জ। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সিনেমা— ‘দ্য ক্রিমেটর’ [১৯৬৯]। অসাধারণ এডিটিং-সমৃদ্ধ এই মাস্টারপিস সিনেমাটিকে শুধুমাত্র হাঙ্গেরিয়ান ফিল্মমেকার ক্যারোলি মাকের ‘লাভ’ [১৯৭১] ও “ক্যাট’স প্লে”র [১৯৭২] সঙ্গেই তুলনা করা সম্ভব; অবশ্য আরেক হাঙ্গেরিয়ান ফিল্মমেকার হাসজারিক জোল্টানের অনালোচিত মাস্টারপিস সিনেমা ‘সিন্দবাদ’-এর [১৯৭২] সঙ্গেও এর তুলনা টানা সম্ভব। [তবে হাঙ্গেরিয়ান সিনেমা নিয়ে কথা হোক না হয় অন্য কখনো।] জুরাজ হার্জের অন্য যে সিনেমাগুলো দেখা আবশ্যক, সেই তালিকায় রয়েছে ‘দ্য ভার্জিন অ্যান্ড দ্য মনস্টার’ [১৯৭৮]। এটি কিন্তু মোটেও ‘বিউটি অ্যান্ড বিস্ট’ রূপকথার অন্য গতানুগতিক সিনেমাগুলোর মতো নয়। এর অসাধারণ সব দৃশ্য যেকোনো দর্শককে মুহূর্তে নতুন এক পৃথিবীতে নিয়ে যেতে সক্ষম। এই ক্ল্যাসিক রূপকথাটিকে একটি অসাধারণ হরর ফিল্মে রূপান্তরের পথে ‘বিস্ট’-এর মাথায় সিংহ নয়, বরং ঈগল বসিয়েছেন হার্জ। হরর জগতে এরপরে হার্জ ফিরেছেন ‘উপির জেড ফেরাতু’ [১৯৮১] সিনেমা দিয়ে; রক্ত-চালিত এক ভ্যাম্পায়ার-কার নিয়ে এক অদ্ভুত সিনেমা এটি।
দুই জাদুকরের স্বপ্ন ঘিরে বানানো ‘ইন্টিমেট লাইটিং’ [১৯৬৫] হলো ইভান প্যাসারের একমাত্র চেক ফিচার ফিল্ম। এর পরপরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পরে তিনি আর যা যা বানিয়েছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘সিলভার বিয়ারস’ [১৯৭৭]। অভিনয়ে মাইকেল কেইনকে নিয়ে নির্মিত এই কমেডি/ক্রাইম সিনেমাটি আরেকটি ভুলতে-বসা ক্ল্যাসিক সিনেমা, যেটির পুনরাবিষ্কার প্রয়োজন।
জিরি মেঞ্জেলের সবচেয়ে বিখ্যাত সিনেমা ‘ক্লোজলি অবজার্ভড ট্রেনস’ [১৯৬৬]। ‘চেক নিউ ওয়েভ’-এর অনেকগুলো সিনেমায় তিনি অভিনয়ও করেছেন; অভিনয় করেছেন নিজের ‘ক্যাপ্রিসিয়াস সামার’-এও [১৯৬৮]। ঘুমন্ত এক গ্রামের কাহিনি এটি। সেখানে নদীতে সাঁতরে বেড়ায় ও দর্শন-চর্চা করে বুড়োরা। একজন সার্কাস অ্যাক্রোব্যাট ও তার সুন্দরী অ্যাসিস্টেন্ট সেখানে বেড়াতে এলে এই বুড়োরা বেশ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। জিরি নির্মিত অন্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘সিক্লুসন নিয়ার অ্যা ফরেস্ট’ [১৯৭৬] ও ‘মাই সুইট লিটল ভিলেজ’ [১৯৮৬] বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
হলিউডে সিনেমা বানানোর কারণেই সম্ভবত ‘চেক নিউ ওয়েভ’-এর সবচেয়ে বিখ্যাত ফিল্মমেকারদের মধ্যে অন্যতম হয়ে আছেন মিলোস ফোরম্যান। তিনি যখন শিশু, তখন অসউইচ বন্দিশিবিরে তাঁর বাবা-মা খুন হন নািসদের হাতে। বয়স ত্রিশে পৌঁছানোর পরপরই ‘কনকার্স’ [১৯৬৪], ‘দ্য লাভস অব অ্যা ব্লন্ড’ [১৯৬৫] ও “দ্য ফায়ারম্যান’স বল”-এর মতো [১৯৬৭] সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে এ জগতে প্রবেশ করেন তিনি। আর সৃষ্টি করেন কমেডির একটি নিজস্ব স্টাইল। ১৯৬৮ সালের গ্রীষ্মে প্রাগ বসন্ত [আন্দোলন] থামানোর জন্য ওয়ারশো প্যাক্টের সৈন্যরা তার দেশ দখল করে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ইউরোপ ছাড়েন তিনি। সেখানে নির্মিত তাঁর “ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাকু’স নেস্ট” [১৯৭৫], ‘অ্যামাডিয়াস’ [১৯৮৪] ও ‘দ্য পিপল ভার্সেস ল্যারি ফ্লিন্ট’ [১৯৯৬] ফিল্মগুলো তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। ব্যক্তিগতভাবে আমি দাবি করতে চাই, আমেরিকায় বানানো ফিল্মগুলোর চেয়ে বরং নিজ দেশে ক্যারিয়ারের শুরুতে বানানো তার ফিল্মগুলোই বেশি শক্তিমান, এবং সেগুলো দেখলে সহজেই উপলব্ধি করা সম্ভব এই ফিল্মমেকারের মুন্সিয়ানাকে।
সূত্র : মুভি ডট কম
