আজ পহেলা মে-আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালে হে মার্কেট অ্যাফেয়ারের রক্তাক্ত স্মৃতি এই দিবসের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছে। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে জীবন বিসর্জন দানকারী শ্রমিকদের আত্মত্যাগ মানবসভ্যতাকে এক গভীর সত্য শিক্ষা দিয়াছে-অধিকার কভু অনুগ্রহে আসে না, সংগ্রামের ভিতর দিয়াই তাহার অর্জন ঘটে।
কিন্তু আজকের প্রশ্ন কেবল ইতিহাসস্মৃতি নহে, বরং-শ্রমের ধারণা কি একই রূপে স্থির থাকিয়াছে? 'শ্রমিক' শব্দটি কি এখনো কেবল কারখানার ধোঁয়া, খেতখামারের কাদা কিংবা নির্মাণস্থলের ঘামের মধ্যে সীমাবদ্ধ? বাস্তবতা ইহা নির্দেশ করে যে, শ্রম আজ বহুমাত্রিক। দৈহিক শক্তি, মেধা, সৃজনশীলতা, তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর দক্ষতা-সকল কিছুর সম্মিলিত প্রয়োগই আধুনিক শ্রম। সেই অর্থে, সমাজের প্রায় প্রত্যেক কর্মক্ষম ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে শ্রমিক-কেহ যন্ত্র চালান, কেহ তথ্য বিশ্লেষণ করেন, কেহ নীতি নির্ধারণ করেন, আবার কেহ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তবে এই প্রসারণের মধ্যেই এক সূক্ষ্ম বিভ্রান্তিও নিহিত। মালিক ও শ্রমিককে একাকার করিবার প্রবণতা বাস্তবতার জটিলতাকে আড়াল করে। সত্য এই যে, উভয়ের ভূমিকা ভিন্ন, দায়ও ভিন্ন; কিন্তু তাহারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নহে-বরং এক অবিচ্ছেদ্য উৎপাদন-সম্পর্কের অংশ। এই সম্পর্কের ভিত মজবুত না হইলে অর্থনীতি টিকিয়া থাকে না। শ্রমিকের দায়িত্ব যেমন আছে-সময়ানুবর্তিতা, নিষ্ঠা, উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা-তেমনই মালিক পক্ষের দায়িত্ব আরো সুস্পষ্ট ও অনিবার্য। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নহে-ইহা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।
ইতিহাসের এই প্রচলিত টানাপড়েনের মধ্যেই আবির্ভূত হইয়াছে এক নূতন শক্তি-এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ইহা কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নহে, বরং শ্রমের ধারণাকেই মৌলিকভাবে পরিবর্তন করিবার ক্ষমতা রাখে। আগামী কয়েক দশকে বহু প্রচলিত কাজ বিলুপ্ত হইতে পারে-বিশেষত যেই সকল কাজ নিয়মিত, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং তথ্যনির্ভর। কারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, অফিসের অ্যালগরিদমিক বিশ্লেষণ, এমনকি সৃজনশীল ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রা শ্রমবাজারে এক গভীর রূপান্তর আনিতেছে। ইহার অর্থ এই নহে যে, কাজ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইবে। বরং কাজের প্রকৃতি পরিবর্তিত হইবে। নূতন দক্ষতা, যেমন-ডেটা বিশ্লেষণ, সৃজনশীল চিন্তা, জটিল সমস্যা সমাধান এবং মানবিক বোধসম্পন্ন সেবা-এইগুলি অধিক মূল্যবান হইয়া উঠিবে। যাহারা এই পরিবর্তনের সহিত নিজেকে খাপ খাওয়াইতে পারিবে না, তাহারা ক্রমশ শ্রমবাজারের প্রান্তে ঠেলিয়া দেওয়া হইবে। ফলে একটি নূতন বৈষম্যের আশঙ্কা দেখা দিতেছে-তাহা হইল 'দক্ষতা-বৈষম্য'।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিক-তিন পক্ষেরই নতুন দায়িত্ব আবির্ভূত হইয়াছে। রাষ্ট্রের কর্তব্য-শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা, যাহাতে ভবিষ্যতের শ্রমশক্তি পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত থাকে। মালিকপক্ষের কর্তব্য-শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা, তাহাদিগকে কেবল প্রতিস্থাপনযোগ্য উপাদান হিসাবে না দেখা। আর শ্রমিকদের কর্তব্য-নূতন জ্ঞান অর্জনে ও প্রযুক্তি শিক্ষণে আগ্রহী হওয়া, পরিবর্তনের প্রতি উন্মুক্ত থাকা।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণেও শ্রমের মর্যাদা অপরিসীম। ইসলাম হউক বা অন্য ধর্ম-সকলেই শ্রমকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছে; কিন্তু আধুনিক যুগে এই নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে প্রযুক্তিগত ন্যায্যতার প্রশ্ন-যেইখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সৃষ্ট সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া উঠিবে। অতএব, আজকের মে দিবস কেবল অতীতের স্মরণ নহে-ইহা ভবিষ্যতের প্রস্তুতির আহ্বান। আমাদের প্রয়োজন একটি 'নতুন সামাজিক চুক্তি'-যেইখানে প্রযুক্তি মানবকল্যাণের সহায়ক হইবে, মানবশ্রমের প্রতিদ্বন্দ্বী নহে। যেইখানে উৎপাদনশীলতার সুফল সুষমভাবে বণ্টিত হইবে এবং যেইখানে শ্রমিক কেবল শ্রমদাতা নহে, বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সক্রিয় অংশীদার। প্রযুক্তির শক্তিকে মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করিয়া আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টিকসই কর্মভবিষ্যৎ নির্মাণ করিব-ইহাই হউক মে দিবসের অঙ্গীকার।
