মাদক ও কিশোর গ্যাং আমাদের সমাজেরই আয়না

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ০৫:২৩

দেশের নগর ও গ্রামীণ সমাজে বেশ কিছু বৎসর ধরিয়া ‘কিশোর গ্যাং' নামক সামাজিক ব্যাধি ভয়ংকরভাবে বিস্তার লাভ করিতেছে। গতকাল বুধবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, এই গ্যাং-সংস্কৃতির মূল উৎসস্থল হইল ‘মাদক’। মাদক কেবল ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না—ইহা একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মকে সহিংসতা, অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলিয়া দেয়। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হইল—১৫ হইতে ৩০ বছর বয়সি কিশোর- তরুণদের মধ্যে এই আসক্তি সর্বাধিক। যাহাদের হাতে বই থাকার কথা, তাহারা আজ ইয়াবা ও গাঁজার মতো ভয়াবহ মাদকের সঙ্গে জড়াইয়া পড়িতেছে। এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিগত নয়; ইহা একটি সামাজিক বিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী প্রভৃতি এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রসহ কিশোরদের ঘুরিয়া বেড়ানো এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিতেছে। ইহা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নির্দেশ করে না, বরং ইহা সমাজের নৈতিক ভিত্তির ভঙ্গুরতাও প্রকাশ করে।

এই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপরিধি সীমাবদ্ধ নহে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি হইতে শুরু করিয়া ভাড়ায় খুন পর্যন্ত—সমস্ত অপরাধ চক্রে তাহাদের সম্পৃক্ততা লক্ষ করা যায়। আরো উদ্বেগজনক হইল, তথাকথিত ‘বড় ভাই' এবং প্রভাবশালী মহলের একটি অংশ এই কিশোরদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করিতেছে। ফলে কিশোররা অপরাধের কেবল বাহকই নহে; তাহারা একটি সুসংগঠিত অপরাধ অর্থনীতির অংশে পরিণত হইতেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাইতেছে—গ্রেফতার হইতেছে, মাদক উদ্ধার হইতেছে; কিন্তু প্রশ্ন থাকিয়া যাইতেছে : এই দৃশ্যমান তৎপরতা সত্ত্বেও সমস্যার গভীরতা কেন কমিতেছে না? কারণ, আমরা লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত; কিন্তু রোগের উৎস অক্ষত রাখিতেছি। সীমান্ত দিয়া মাদকের প্রবাহ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা—এই তিনটি সমস্যা অটুট থাকিলে কিশোর গ্যাং দমন কেবল পরিসংখ্যানের সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে। এই ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানীরা যাহা বলিতেছেন, তাহা আরো ভয়াবহ। নিয়মিত মাদকসেবনে কিশোরদের আবেগপ্রবণতা লোপ পাইতেছে, সহানুভূতি কমিতেছে, সহিংসতা তাহাদের নিকট স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হইতেছে। অর্থাৎ, আমরা কেবল অপরাধ বাড়িতেছে বলিয়া উদ্বিগ্ন নহি—আমরা একটি আবেগহীন, বিচ্ছিন্ন, সহিংস মানসিকতার প্রজন্ম গঠনের সাক্ষী হইতেছি।

এই প্রেক্ষাপটে করণীয় বিষয়গুলি নূতন নহে; কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা কি অস্বীকার করা যায়? যদিও মাদক নিয়ন্ত্রণ সহজ বিষয় নহে। বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশও মাদক নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায়; কিন্তু তাহা বলিয়া আমাদের যাহা করিবার সুযোগ রহিয়াছে, তাহা না-করাটা অপরাধ। আসলে মাদকের ব্যবসা এমনই ব্যবসা, যাহাতে সংশ্লিষ্টরা অবৈধ অর্থে রাতারাতি আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হইয়া যায়। কোনো জনপদ যখন মাদকের সাগরে ভাসে, তখন মাদকের প্রলোভন হইতে কিশোরদের রক্ষা করা সহজ কাজ নহে। অন্যদিকে, যেই সমাজ কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, অর্থবহ শিক্ষা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করিতে পারে না, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করিতে হইবে। কিশোরদের বিকল্প ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি—এই সকল পদক্ষেপ অপরিহার্য। সর্বোপরি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নহে।
অতএব, কিশোর গ্যাং সমস্যা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ প্রবণতা নহে—ইহা আমাদের সময়ের একটি আয়না, যাহাতে আমরা নিজেদের ব্যর্থতা দেখিতে পাই। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের : আমরা কি কেবল এই আয়নায় তাকাইয়া ভয় পাইব, নাকি সাহস করিয়া ইহার ভিতরের বাস্তবতাকে বদলাইবার উদ্যোগ গ্রহণ করিব?

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন