সুপেয় পানি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান

আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৩:২৫

আমাদের উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সবচাইতে বড় ও প্রধান সমস্যা হইল সুপেয় বা খাওয়ার পানির তীব্র সংকট। চারদিকে নদী, খাল, জলাভূমি ও বিস্তীর্ণ জলরাশি থাকিলেও পানের উপযোগী বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষের হাহাকার ক্রমেই তীব্রতর হইয়া উঠিতেছে। লবণাক্ততার কারণে উহা পান করিবার অনুপযুক্ত বিধায় উপকূলের অধিকাংশ বাসিন্দাই সুপেয় পানি হইতে বঞ্চিত। পত্রিকান্তরে জানা যায়, এইরূপ ভোগান্তির শিকার উপকূলের ৭৩ শতাংশ মানুষ । অর্থাৎ, দেড় কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি পান করিতে বাধ্য হইতেছে । কেবল বাগেরহাটের মোংলা উপজেলারই ৬৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থাই নাই । জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ব্যাঘাত, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ এবং ঘূর্ণিঝড়- জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠস্থ পানির উৎস আজ মারাত্মকভাবে দূষিত ও লবণাক্ত হইয়া পড়িবার ফলে সুপেয় পানির সংকট এখন আর কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই; বরং তাহা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হইয়াছে ।

গ্রামীণ নারীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করিয়া পানির সন্ধানে যাইতে হয় । কোথাও কোথাও একটিমাত্র টিউবওয়েল কিংবা পুকুরের পানির উপর নির্ভর করিয়া বাঁচিয়া রহিয়াছে শত শত পরিবার । অনেকে বাধ্য হন দূষিত পানি পান করিতে; ফলে তাহাদের স্বাস্থ্যগত বিষয়টিকেও আমলে লইতে হইবে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীকাল অতিক্রম করিয়া আসিবার পরেও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ পানির জন্য এইরূপ সংগ্রাম করিতে হইতেছে—ইহা নিঃসন্দেহে আমাদের ব্যর্থতার পরিচায়ক ।

দুঃখজনক হইলেও সত্য, উপকূলের এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রহিয়াছে বরাবরই। নানা প্রকল্প, প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা শুনা গেলেও বাস্তবে অধিকাংশ উদ্যোগই সীমাবদ্ধ থাকিয়া গিয়াছে কাগজে কলমে । কতিপয় ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প, পুকুর পুনঃখনন কিংবা পানি শোধনাগার স্থাপন করা হইয়াছে, তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাহাও অকার্যকর। অথচ উন্নত বিশ্বে আমরা কী দেখি? মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ, বিশেষত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করিবার জন্য আধুনিক ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করিয়াছে। সিংগাপুর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য পানি পুনঃশোধন এবং উন্নত জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানিসংকট মোকাবিলায় বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছে। নেদারল্যান্ডস জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসাবে গড়িয়া তুলিয়াছে টিকসই পানি অবকাঠামো। উন্নত বিশ্ব বুঝিয়াছে—ভবিষ্যতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হইবে পানি। অর্থাৎ, অন্যান্য দেশ যেইখানে সুপেয় পানির সংকটকে ভবিষ্যতের অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তাঝুঁকি হিসাবে বিবেচনা করিতেছে, সেইখানে আমরা বৎসরের পর বৎসর বিষয়টিকে অবহেলা করিয়া যাইতেছি—ইহার ফল কি সুখকর হওয়ার কথা ? সুপেয় পানি আজ শুধু মানবজীবনের মৌলিক প্রয়োজন নহে, ইহা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ।

বাংলাদেশের পরিবেশগত বাস্তবতা এমনিতেই উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাইতেছে, নদনদীগুলি মরিয়া যাইতেছে, হুহু করিয়া নামিয়া যাইতেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর । অথচ পরিতাপের বিষয়, এমন একটি বৃহৎ সংকট হইতে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা নাই প্রত্যাশা অনুযায়ী । উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক পানি শোধনাগার স্থাপন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরাইয়া আনা এবং লবণাক্ততার বিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে আমাদের অগ্রগতি কতটুকু? এখন অবধি আমরা স্থানীয় পর্যায়ে টিকসই পুকুর সংরক্ষণ ও পুনঃখনন কার্যক্রমই জোরদার করিতে পারিলাম না—ইহার চাইতে দুঃখজনক আর কী হইতে পারে?

ভুলিয়া গেলে চলিবে না, সুপেয় পানি কেবল উন্নয়ন বা অবকাঠামোর প্রশ্ন নহে; ইহা মানুষের বাঁচিয়া থাকিবার অধিকার। উপকূলের মানুষকে অবহেলার অন্ধকারে রাখিয়া টিকসই উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কেবল কঠিনই নয়, অনেকটা অসম্ভব। অতএব, সুপেয় পানিকে সত্বর জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসাবে বিবেচনা করিতে হইবে । আমাদের এই ক্ষমাহীন উদাসীনতার মূল্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে না হয়, সেই কথা চিন্তা করিয়া আমাদের নিরলসভাবে কাজ করিয়া যাইতে হইবে ।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন