শওকত ওসমানের লেখক জীবনের শুরু থেকেই সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল। তার সারা জীবনের লেখায় সেই দায়বদ্ধতারই প্রকাশ ঘটেছে-এমনটাই জানিয়েছেন বিশিষ্ট লেখক হাসনাত আবদুল হাই।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এক মিলনায়তনে আয়োজিত এ সভায় তিনি এ কথা বলেন।
জানা যায়, এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সুকোমল বড়ুয়া। এতে সভাপতিত্ব করেন কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই।
হাসনাত আবদুল হাই বলেন, কথাশিল্পী শওকত ওসমান লিখেছেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। তিনি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য বা নিছক বিনোদনের জন্য লেখালেখি করেননি। সমাজের শোষণ, অনাচার, নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনসংগ্রাম তার রচনায় ফুটে উঠেছে। তার লেখা ও তার মতো মানুষ আমাদের জাতির সম্পদ।
হাসনাত আবদুল হাই তার বক্তব্যে অগ্রজ কথাশিল্পী শওকত ওসমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, শওকত ওসমানের লেখক জীবনের শুরু থেকেই সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল। তার সারা জীবনের লেখায় সেই দায়বদ্ধতারই প্রকাশ ঘটেছে। লেখক হিসেবেও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তাঁর প্রভাব রয়েছে। হয়তো এই প্রভাব সরাসরি নয়। তবে সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই পূর্ববর্তী প্রতিভাবানদের সৃজনকর্মের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের ওপরে থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা চলমান থাকে। শওকত ওসমান আমাদের কথাসাহিত্যে তেমনি একজন অনন্য প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী সৃজনশীল মানুষ।
শওকত ওসমানকে মৃত্যুঞ্জয়ী আখ্যায়িত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, শওকত ওসমান তার লেখায় মানুষের বিবেক, মানবিক বোধ ও আত্মশক্তিকে জাগানোর চেষ্টা করেছেন। প্রতিটি সমাজেই এমন কিছু কিছু মানুষ থাকেন, যারা মানুষের ভেতরে প্রাণের বিপুল স্পন্দন জাগাতে পারেন। সাগরের মতো কল্লোল সৃষ্টি করতে পারেন। এই জাগরণের চেষ্টাকেই তারা তাদের সারা জীবনের কাজ বলে গ্রহণ করেন। শওকত ওসমানের লেখালেখি ছিল ঠিক সেই ধরনের কাজ। লেখনীর মাধ্যমে তিনি মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছেন, মানুষের মানবিক মহিমার জয়গান গেয়েছেন। এ জন্যই তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তিনি বলেন, ‘কথাশিল্পী শওকত ওসমান আমাদের গৌরব। শওকত ওসমান তো কোনো সরকারের নয়, কোনো দলের নয়। তিনি তার সৃষ্টি ও মননের মাধ্যমেই এসবের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন। তাকে জাতীয় পর্যায়ে স্মরণ করা উচিত। কারণ তিনি তার সৃষ্টি দিয়ে এ মাটিকে ধন্য করে গেছেন।’
সভায় কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. দীপু সিদ্দিকী বলেন, ‘শওকত ওসমান ছিলেন মানবতাবাদী মানুষ। তিনি শুধু তার কথাসাহিত্যে নয়, জীবনব্যাপী চর্চায় সেটা প্রকাশ করে গেছেন। তাকে আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে তার সাহিত্যদর্শনকে চর্চা করতে হবে।’
মেরিন নাজনীনের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয় কথাশিল্পী শওকত ওসমানকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শওকত ওসমান’।
উল্লেখ্য, শওকত ওসমানের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি। ১৯৯৮ সালের ১৪ মে তিনি চিরবিদায় নেন। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিচারণাসহ তার রচনা সম্ভার বিপুল ও বৈচিত্র্যময়।
