ভারতে বিজেপিকে ছাড়িয়ে গেল ‘নতুন দল’ সিজেপি

আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ১৫:১০

ভারতের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগ কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং মূলধারার রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। আদালতের এক শুনানিতে তিনি বেকার তরুণদের একটি অংশকে, যারা সাংবাদিকতা ও আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছে, 'তেলাপোকা' ও 'পরজীবী' হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, মন্তব্যটি সাধারণ তরুণদের উদ্দেশে নয়; ভুয়া ডিগ্রিধারীদের প্রসঙ্গে করা হয়েছিল।

তবে এরই মধ্যে বিষয়টি অনলাইনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সেই প্রেক্ষাপটে শুরু হয় 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি। নামটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির নামের ব্যঙ্গাত্মক রূপ।

সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও অনলাইন সংস্কৃতিনির্ভর একটি প্ল্যাটফর্ম। তাদের সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে মজার ছলে বলা হয়েছে—'বেকার, অলস, সবসময় অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের সক্ষমতা থাকতে হবে।'

Screengrab from Cockroach Janta Party's website Cockroach wearing sunglasses standing behind a podium with a microphone, framed inside a circular emblem in orange, white, and green. Below the emblem, bold text reads - Cockroach Janta Party

উদ্যোগটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এর আগে তিনি আম আদমি পার্টির সঙ্গে কাজ করেছেন। তার ভাষ্য, শুরুতে এটি ছিল কেবল একটি রসিকতা।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপির সদস্য হতে হাজার হাজার মানুষ গুগল ফর্মে নিবন্ধন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #MainBhiCockroach হ্যাশট্যাগও ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব এক পোস্টে লিখেছেন, 'বিজেপি বনাম সিজেপি'।

অনলাইনের বাইরে বাস্তবেও এর প্রভাব দেখা যায়। বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ও বিক্ষোভে তরুণদের কেউ কেউ তেলাপোকার পোশাক পরে অংশ নেন।

সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা কয়েক দিনের মধ্যেই এক কোটির বেশি ছাড়িয়ে যায়, যা বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অনুসারীর সংখ্যাকেও অতিক্রম করেছে। তবে সিজেপির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ভারতে বর্তমানে অদৃশ্য রয়েছে। সেখানে প্রবেশ করতে গেলে 'আইনি অনুরোধের প্রেক্ষিতে অ্যাকাউন্টটি আটকে দেওয়া হয়েছে'—এমন বার্তা দেখা যাচ্ছে।

সমর্থকদের মতে, সিজেপি এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন স্বস্তি এনে দিয়েছে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। বিরোধী নেত্রী মহুয়া মৈত্র, রাজনীতিক কীর্তি আজাদ এবং আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের মতো ব্যক্তিরাও এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এটি মূলত বিরোধী ঘরানার ডিজিটাল রাজনৈতিক প্রচারণা, যা পরিকল্পিতভাবেই ছড়ানো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির উত্থান ভারতের তরুণদের হতাশা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত হলেও, অনেক তরুণই নিজেদের প্রতিনিধিত্বহীন মনে করেন। কর্মসংস্থান, বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অথচ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোতে তাদের আগ্রহ কমছে।

সিজেপির ওয়েবসাইটেও সেই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। নিজেদের তারা 'অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর' হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। একই সঙ্গে জবাবদিহি, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর মতো বিষয়ও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এটি হয়তো সাময়িক অনলাইন ট্রেন্ড হিসেবেই মিলিয়ে যেতে পারে। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই সিজেপি ভারতের তরুণদের একাংশের হতাশা ও ক্ষোভকে নতুন ভাষা দিয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন