বিনা মূল্যে পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে ১৬ বছর ধরে চলে আসা অনিয়ম এবার চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকার অপচয় আটকানো হয়েছে। জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের (২০২৭) জন্য এপ্রিলের শুরুতে এনসিটিবিতে সব উপজেলা থেকে বইয়ের চাহিদা পাঠানো হয়। তাতে দেখা যায়, ২৩ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১১ কপি পাঠ্যবই দরকার।
এ বইয়ের সংখ্যা আগের শিক্ষাবর্ষের (২০২৬) চেয়ে প্রায় এক কোটি বেশি। ফলে এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। এরপর শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় উপজেলাগুলোতে বইয়ের চাহিদা সঠিক দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে পরিদর্শনে পাঠানো হয়। এতে বিভিন্ন উপজেলায় ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। ৯৯ লাখ বইয়েরই কোনো প্রয়োজন নেই বলে এনসিটিবির তদন্তে উঠে এসেছে। অর্থাত্ প্রয়োজনের অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা জেলা-উপজেলা থেকে দেওয়া হয়েছিল। সূত্র জানায়, এনসিটিবির তদন্তে উঠে এসেছে, অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা দেওয়া সিন্ডিকেটে কিছু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং ছাপাখানা-সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জড়িত। এর মধ্যে যেসব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জড়িত তাদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে এনসিটিবি।
এনসিটিবির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত ১৬ বছর ধরে প্রতি বছরই এক থেকে দেড় কোটি অতিরিক্ত চাহিদার পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেড় হাজার কোটির বেশি সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়েছে। এবার অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদার বিষয়টি একাধিক সংস্থার প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেন।
তার নির্দেশে এনসিটিবি বিষয়টি যাচাই না করলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এসব বই ছাপানো হয়ে যেত এবং এর পেছনে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকার অপচয় হতো।’ জানা গেছে, ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের চেয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ১৭৯ শতাংশ বেশি পাঠ্যবই চাওয়া হয়। এছাড়া ফেনী সদর উপজেলায় ৪১ শতাংশ বেশি পাঠ্যবই পাঠানোর আবদার করা হয়। একইভাবে নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভূতুড়ে চাহিদার তথ্য আসতে থাকে। পরে সব উপজেলা থেকে পুনরায় চাহিদা পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এদিকে এনসিটিবির যাচাইয়ের মুখে চলতি মে মাসে পুনরায় চাহিদা পাঠিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। তাতে দেখা যায়, আগের চেয়ে এবার ৯৯ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৮ কপি পাঠ্যবই কমেছে। অর্থাত্, আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক, কারিগরি ও ইবতেদায়ির জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪১ হাজার ৪৯৩ কপি বই লাগবে। এতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু বলেন, ‘অনেক উপজেলা থেকে ভুয়া চাহিদা পাঠানো হয়েছিল। আমরা এ নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। তদন্তে নামার পর ভুয়া চাহিদায় লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে। এতে প্রায় ৯৯ লাখ বই কমেছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে সরকারের খরচও কমবে।’
দুই ছাপাখানা মালিককে ৩৮ লাখ টাকা জরিমানা: এদিকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাইমারির পাঠ্যবই নিম্নমানের কাগজে ছাপানোর ঘটনায় দুটি ছাপাখানার মালিককে ৩৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছে এনসিটিবি। এর মধ্যে বলাকা ও সরকার প্রেসের মালিক দুলাল সরকারকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আর লেটার এন্ড কালার প্রেসের মালিক মো. সিরাজুল ইসলামকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু বলেন, ‘পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে অনিয়মে জড়িত বেশ কিছু ছাপাখানাকে জরিমানা করা হয়েছে।’
