আমিনুল হক শাহীন
ঘটনাটি ২০১১ সালের ১১ মার্চে। শতাব্দীর অন্যতম প্রলয়ঙ্করী সুনামির তোড়ে ভেসে যাচ্ছিল জাপানের একটি বড় অংশ। সুনামির পরও মুহুর্মুহু ভূমিকম্পে কেঁপে কেঁপে উঠছিল পুরো জাপান। আমি সেসময় পরিবারসহ জাপানের নাগোয়াতে বসবাস করতাম। সুনামি আর ভূমিকম্পের যুগল আঘাতে যখন ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের অবস্থা খুব খারপের দিকে চলে যেতে শুরু করল, তখন আরো ভয়ঙ্কর কিছু আসন্ন সংকটের ভয়ে আমি গেলাম সুপারশপে কিছু শুকনো খাবার আর পানি কিনতে। সুপারশপে গিয়ে দেখলাম বড় বড় করে নোটিশে লেখা আছে—একসঙ্গে দুই বোতলের বেশি পানি কেনা যাবে না।
আমার ধারণা ছিল এমন ভয়াবহ দুর্যোগের পর প্রথম ধাক্কাতেই জাপানে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। কিন্তু কী আশ্চর্য! কোনো জিনিসের দাম এক ইয়েনও বাড়ল না। একদিন টিভিতে একটা শেল্টারের ভিডিও দেখাচ্ছিল। দেখলাম পোশাক কোম্পানিগুলো ট্যাগ লাগানো নতুন গরম জামাকাপড় ডাম্প করে রেখে গেছে। যার যার দরকার তারা সাইজ মিলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কে রেখে গেছে সেটা প্রকাশেরও কোনো বালাই নেই, যারা নিচ্ছে তাদের ভেতরেও কোনো হইচই নেই।
এদিকে, এবার ঢাকা যখন ডেঙ্গুতে বিধ্বস্ত, তখন পত্রিকায় খবর ছাপা হচ্ছে যে, ডেঙ্গু-পরীক্ষার কিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ব্যবসা করছে কেউ কেউ। ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী, সরকার পরীক্ষার দাম বেঁধে দিলেও মানছে না অনেক হাসপাতাল। এদিকে মশা প্রতিরোধক ক্রিম ওডোমস নাকি বিক্রি হচ্ছে দশগুণ বেশি দামে!
ছাত্রাবস্থায় আমি জাপানের জুতাকুতে থাকতাম। একেকটা বড় বিল্ডিংয়ে প্রায় ৫০-৬০টি পরিবার। প্রতি মাসের প্রথম রবিবার সকালে প্রতিটি পরিবারের একজন সদস্যকে নিচে নামা ছিল বাধ্যতামূলক। এরপর সবাই মিলে বিল্ডিংয়ের চারপাশ পরিষ্কার করতে হয়। মাসিক এই পরিষ্কার অভিযানে অনুপস্থিত থাকার কোনো উপায় নেই। যদি কেউ কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকতেন তবে তাকে দুই হাজার ইয়েন জরিমানা গুনতে হয়। আমরা বিদেশিরা যে মাঝে মধ্যে ভুলে গিয়ে জরিমানা গুনতাম, তা তারা খুব খারাপ চোখে দেখতেন। ঢাকা শহরের প্রতিটা বিল্ডিংয়ে কমপক্ষে আটটা করে ফ্যামিলি আছে। তারা যদি নিয়ম করে মাসে এক দিন বিল্ডিং পরিষ্কার করে তাহলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কি খুব কঠিন কাজ?
আমাদের জাপানের বাসার পাশে একটা বেকারি ছিল। প্রতি সপ্তাহের একটি দিন দেখতাম বেকারির চারপাশের প্রায় ৫০০ গজ পর্যন্ত জায়গা ওদের সব স্টাফ মিলে পরিষ্কার করছেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জাপানের রাস্তায় ময়লা আবর্জনা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খোঁজা লাগে। তারপরেও ওদেরকে দেখতাম ড্রেন থেকে বা গাছের নিচ থেকে একটা-দুটো পাতা বা কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত এটা ওদের সামাজিক দায়িত্ববোধ। একদিন হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে ছিলাম। ডাক্তার-নার্সরা একটা পেশেন্ট রিসিভ করছিলেন। আমি রোগীর বেড থেকে একটু দূরে আমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমি আগেই খেয়াল করেছিলাম বেডের পাশে কটন বা অন্য কোনো আবর্জনা পড়ে আছে। দেখেও আমি না দেখার ভান করে তার সাথেই কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। উনি যখনই দেখলেন কিছু একটা পড়ে আছে নিচে, সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাতে সেগুলো পরিষ্কার করে ফেললেন। বলাবাহুল্য এর পর থেকে কখনো আমি কোনো ময়লা না দেখার ভান করে থাকতে পারিনি।
বাংলাদেশের ডাক্তার-নার্সরা ডেঙ্গু নিয়ে অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি মুহূর্তেই তাদের নিজেদেরও আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে। তবু তারা সাধ্যমতো ডেঙ্গু রোগীর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই সার্ভিস, ডেডিকেশন ও প্রফেশনালিজম দেখে আমার ফুকুশিমার পারমাণবিক চুল্লির রিয়াক্টর ঠান্ডা করার জন্য যেসব কর্মী চৌবাচ্চায় সারাদিন সারারাত গ্যালন গ্যালন পানি ঢেলেই যাচ্ছিল—তাদের কথা মনে হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গু শুধু ডাক্তার বা নার্সদের সমস্যা নয় কিংবা এর সমাধানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা মেয়রদের ভূমিকা প্রধান হলেও তারাই শুধু সমাধান দিতে পারেন না। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে হলে নিজ নিজ পরিসরে সবাইকেই ভূমিকা রাখতে হবে।
দেশের বাইরে থাকার এক বড়ো সমস্যা হলো প্রতি মুহূর্তেই টেনশনে থাকতে হয় এই বুঝি কোনো খারাপ খবর এলো। আমার আম্মা ফোনে বললেন, ‘খুব খারাপ অবস্থা এখন। কিন্তু এক সময় দেশে বসন্ত ছিল, তারপরে এসেছিল কলেরা। ঐগুলো শেষ হয়ে গেছে। এই ডেঙ্গুও শেষ হয়ে যাবে একদিন।’ আমি আমার মায়ের মতোই আশাবাদী। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবার যে ভয়াবহরূপে ডেঙ্গু আবির্ভূত হলো তা থেকেই মুক্তির পথ রচিত হবে। তবে সবার আগে এ বছরের খারাপ সময় পার করার পর আগামী বছরের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে হবে এ বছর থেকেই।
n লেখক : চিকিত্সক ও গবেষক
