ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানের ধারণা পালটে দিয়েছে যে গেজেট

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৯, ২১:৫৭

অলাভজনক ও জনকল্যাণমূলক ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান ধর্ম মন্ত্রণালয় গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালনার নিয়ম থাকলেও দেশে সম্ভবত প্রথমবারের মতো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে ‘হামদর্দ ল্যাবরেটরীজ (ওয়াক্ফ) বাংলাদেশ’ এর ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় একটি পরিবারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে প্রকাশিত গেজেট নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। গত ১১ মার্চ প্রকাশিত এই গেজেটে হামদর্দের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়াকে আমৃত্যু ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তার অবর্তমানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কারা কোন্ পদে থাকবেন সেটিও সুনির্দিষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে বিতর্কিত এই গেজেটে।

প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ইত্তেফাককে জানান, যদি কেউ জমি বা প্রতিষ্ঠানের দাতা হন—সেক্ষেত্রে ব্যক্তি বা পরিবারের নামে ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানের গেজেট হতে পারে। কিন্তু হাকিম ইউছুফ হারুন বা তার পরিবার হামদর্দের দাতা নন। কার্যত এই ধরনের গেজেটের মাধ্যমে ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান হামদর্দকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে হামদর্দে অসন্তোষ-ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, এই গেজেটটির ফলে ওয়া্কফ সম্পত্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে।

ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এবং হাকিম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া বা তার পরিবার এর দাতা না হলেও কীভাবে এই ধরনের একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখতে ধর্ম মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। গত ২৩ এপ্রিল গঠন করা এই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (সংস্থা) মু আ হামিদ জমাদ্দার এবং দুই সদস্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সংস্থা) মোহাম্মদ মাহবুব আলম ও সহকারী ওয়াক্ফ প্রশাসক (উপসচিব) রায়হান কাওছার। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টি অনুসন্ধান করছে।

বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট প্রেস-বিজি প্রেস থেকে সংগ্রহ করা গেজেটটিতে দেখা যায়, এর ২.১২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘হামদর্দ ওয়াক্ফ এস্টেট-এর মোতাওয়াল্লী’ বলতে হামদর্দ ল্যাবরেটরীজ (ওয়াক্ফ) বাংলাদেশ এর চীফ মোতাওয়াল্লী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়াকে বুঝাবে। তিনি ওয়াকিফ ও চীফ মোতাওয়াল্লী হিসেবে এর ওয়াক্ফ এস্টেটটির পরিচালনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ, স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তার জীবদ্দশায় দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ওয়াকিফ ও চীফ মোতাওয়াল্লী হিসেবে জীবদ্দশায় তার উত্তরাধিকার/বংশধর হতে শিক্ষিত, যোগ্য, বিজ্ঞ তথা উপযুক্ত ০১ (এক) জন ব্যক্তিকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মোতাওয়াল্লী এবং অপর ০২ (দুই) জনকে মোতাওয়াল্লী ও পরিচালক নিযুক্ত/ মনোনয়ন করবেন এবং তার অবর্তমানে তার উত্তরসূরী/বংশধরগণের মধ্য হতে ০৪ (চার) জন মোতাওয়াল্লী অনুরূপভাবে ও ওয়াক্ফ এস্টেটের চীফ মোতাওয়াল্লী/মোতাওয়াল্লী নিয়োগ বা মনোনীত হবে। ভবিষ্যতেও এ প্রথা চালু থাকবে।’

ইউসুফ হারুনের ছোটো ছেলে ও হামদর্দের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জামালউদ্দিন ভূঁইয়া রাসেল ইত্তেফাককে বলেন,‘ওয়াক্ফ কখনো পারিবারিক সম্পত্তি হয় না। হামদর্দের কোনো সম্পত্তি আমাদের পরিবারের কারো নামেও করা হয়নি। আর মোতাওয়াল্লী বলতে মালিক বুঝায় না। আমার বাবার অবদান ও কর্মদক্ষতার কারণেই হামদর্দ দিনে-দিনে এত বড়ো হয়েছে। সেটিরই স্বীকৃতি হিসেবে তার নামেই গেজেটটি করা হয়েছে। এখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি।’ তবে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেছেন, হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের মতো ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানে পরিবারতন্ত্র চলতে পারে না। ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সচেতন আছে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।