রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। প্রতিবেদনে ছয় শিশুর মৃত্যুর কারণ, হাসপাতালের অবহেলা এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে ঐকমত্য পোষণ করেন যে ভবনটি হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, তদন্ত কমিটির নিকট সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ নম্বর-২ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ শেষে প্রতীয়মান হয় যে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন কার্যক্রম না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি হয়েছে এবং এর বিপরীতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।
তৃতীয়ত, তদন্ত কমিটির কাছে সংশ্লিষ্ট কক্ষের দায়িত্বরত সকল সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের বক্তব্যে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, ডিউটিতে থাকা নার্সদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালের সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল রেসপন্স ছিল না। অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোনো চিকিত্সককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যুরোধে প্রয়োজনীয় উপযুক্ত চিকিত্সার ব্যবস্থাও করা হয়নি। চতুর্থত, উক্ত কক্ষটি প্রায় ৯০০ বর্গফুট, যেখানে ১১ জন রোগী, নবজাতক এবং রোগীর লোকসহ প্রায় ৫০ জনের উপস্থিতি ছিল, যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।
পঞ্চমত, তদন্ত কমিটি হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বরত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রমাণ পেয়েছে যে, বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ একটি হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিলেন না। যেমন, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিত্সক ছিল না। ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সেবিকাদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও প্রদান করা হয়নি। এছাড়া ওই পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য ভেন্টিলেশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে রোগী, নবজাতক ও রোগীর অ্যাটেন্ডেন্টসহ অতিরিক্ত সংখ্যক জনবলের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণও করা হয়নি। হাসপাতালটির অভ্যন্তরে যত্রতত্র কাচের ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণের ফলে প্রতিষ্ঠানটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যবহূত ভবন পরিদর্শনপূর্বক পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিলেন না। হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালের ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিত্সক না থাকা, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে তারা করণীয় ঠিক করতে বসবেন। বিদ্যমান আইনে যে শাস্তি রয়েছে, হাসপাতালের বিরুদ্ধে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে আগামী রবিবারের মধ্যে দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্সের বিভিন্ন বাধ্যতামূলক বিধান লঙ্গন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি আনুষ্ঠানিক কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আইন অনুযায়ী এই নোটিশের লিখিত উত্তর দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগামী ৭২ ঘণ্টা অর্থাত্ আগামী রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং নোটিশটি হাসপাতালের মূল গেটে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

