পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করিয়া প্রতি বৎসরের ন্যায় এইবারও রাজধানী ঢাকা হইতে কোটি কোটি মানুষ গ্রামের পথে যাত্রা করিতেছেন। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও শিকড়ের কাছে ফিরিয়া যাইবার এই আবেগঘন যাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ নহে-ইহা দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নাগরিক শৃঙ্খলার এক বৃহৎ পরীক্ষাও বটে; কিন্তু দুঃখজনক হইল, উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সড়কপথে ভোগান্তির শঙ্কাও রহিয়া গিয়াছে।
হাইওয়ে পুলিশ দেশের সাতটি প্রধান মহাসড়কে ৯৪টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করিয়াছে। বিশেষত ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হইয়াছে। কোথাও উন্নয়নকাজ চলিতেছে, কোথাও টোল প্লাজায় ধীরগতি, কোথাও শিল্পাঞ্চল, বাজার কিংবা অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য। ফলে ঈদের শেষ তিন দিনের যাত্রা যে অত্যন্ত চাপপূর্ণ হইবে, তাহা এখনই স্পষ্ট।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলিতেছে, ঈদের আগে তিন-চার দিনে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন। অথচ গণপরিবহনসহ দেশের বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থার সক্ষমতা প্রায় ২২ লক্ষ মানুষের চলাচল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ চাহিদা ও সক্ষমতার এই বিপুল ব্যবধান পূরণ করিতে গিয়াই রাস্তায় নামিয়া পড়ে অনুপযোগী বাস, ট্রাক ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন। ইহাই দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খলা ও দীর্ঘ যানজটের অন্যতম কারণ। সরকার ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে বটে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, বিজিবির টহল, ভ্রাম্যমাণ আদালত, টোল প্লাজায় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা-এই সকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দীর্ঘ ছুটিও কিছুটা চাপ কমাইতে সহায়ক হইতে পারে; কিন্তু অভিজ্ঞতা বলিতেছে, কেবল উদ্যোগ ঘোষণা করিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন ও কার্যকর সমন্বয়।
বাস্তবতা হইল, আমাদের মহাসড়কের বড় সমস্যা কেবল অবকাঠামোগত নহে, ব্যবস্থাপনাগতও বটে। চার লেনের সড়ক নির্মিত হইয়াছে; কিন্তু সড়কের পাশে অবৈধ স্ট্যান্ড, যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা, নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা, বাজারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এবং টোল প্লাজার ধীরগতি সেই সক্ষমতাকে নষ্ট করিয়া দিতেছে। সাভার, বাইপাইল, হেমায়েতপুর কিংবা বিশ্ব রোড গোলচত্বরের দৃশ্য দেখিলে মনে হয়, নিয়ম যেন কেবল কাগজেই বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হইবে মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। মহাসড়কের মূল লেনে বাস থামাইয়া যাত্রী উঠানামার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ প্রতি বৎসর দুই ঈদের সময় বিপুলসংখ্যক তাজা প্রাণ সড়কে ঝরিয়া যায়। বিশেষত যেই সকল স্থানে উন্নয়নকাজ চলিতেছে, সেইখানে বিকল্প ব্যবস্থা, দ্রুত মেরামত ও পর্যাপ্ত নির্দেশনা নিশ্চিত করা আবশ্যক। টোল প্লাজাগুলিতেও অধিক দক্ষতা প্রয়োজন। ডিজিটাল পেমেন্ট চালু হইলেও তাহার কার্যকারিতা নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার উপর। নগদ ও ডিজিটাল উভয় পদ্ধতির জন্য পৃথক লেন চালু করিতে পারিলে সময় অনেক কমিবে। ইহার পাশাপাশি পশুবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী যানবাহনের জন্য পৃথক সময়সূচি নির্ধারণ করিবার বিষয়টিও বিবেচনা করা যাইতে পারে।
তবে সমস্ত দায় কেবল সরকারের নহে। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করিতে হইবে। ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাত্রা না করা, ছাদের উপর ভ্রমণ পরিহার করা, নির্ধারিত স্থান ব্যতীত বাসে উঠানামা না করা এবং ট্রাফিক নির্দেশনা মানিয়া চলা অত্যন্ত জরুরি। ঈদে কয়েক ঘণ্টা পূর্বে গন্তব্যে পৌঁছাইবার চাইতে নিরাপদে পৌঁছানো অধিক গুরুত্বপূর্ণ-এই বোধ আমাদের সকলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল আবহাওয়া। বৃষ্টি হইলে অসমাপ্ত উন্নয়নকাজের এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হইয়া উঠিতে পারে। অতএব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখিতে হইবে, যেন দুর্ঘটনা বা আকস্মিক জট দ্রুত নিরসন করা যায়।
ঈদ যাত্রা হওয়া উচিত আনন্দ, নিরাপত্তা ও মানবিকতার যাত্রা; কিন্তু প্রতি বৎসরই মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকা পড়িতে হয়, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইতে হয়। উন্নত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি উন্নত ব্যবস্থাপনা, কঠোর শৃঙ্খলা ও নাগরিক সচেতনতা-এই তিনটির সমন্বয়েই কেবল স্বস্তির ঈদ যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই বারের ঈদে সেই সক্ষমতারই পরীক্ষা হইবে। আশা করি, সম্মিলিতভাবে সচেতনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখিবার মাধ্যমে এই পরীক্ষা আমরা ভালো মতো উতরাইতে পারিব।

