দেশ জুড়ে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। পোস্টার-ব্যানারের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন। আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না। ফলে আওয়ামী লীগ ছাড়াই জোর নির্বাচনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রথম ধাপ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোরদার প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে বিধিমালা সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সংশোধিত বিধিমালায় অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ, পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ, প্রবাসীর জন্য পোস্টাল ব্যালট বাতিলসহ নির্বাচনি প্রচারে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশিসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন ঠেকাতে জামানতের পরিমাণ বাড়ানোসহ বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বিধিমালায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার এবং ইসির আইন-বিধিমালা সংস্কার কমিটির প্রধান আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আপাতত সংসদে পাশ হওয়া আইনের আলোকে স্থানীয় সরকার বিধিমালার কোন কোন জায়গায় সংশোধন করা যেতে পারে, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। আইন-কানুন চূড়ান্ত হওয়ার পরই ভোটের তপশিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের কথা বলেছে। আমরাও সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনের যে প্রস্তুতি আছে, তাতে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন সম্ভব। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার সরকারের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন ঘটায়। ফলে স্থানীয় নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটারদের প্রত্যাশা সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অক্টোবরে ভোটের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ভোটকেন্দ্রের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, নির্বাচনি সামগ্রী সংগ্রহ এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূলের এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান, মেয়র ও সদস্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় উন্নয়ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। পোস্টার, ব্যানারে ছবি দিয়ে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতারাও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয় উন্নয়ন, সেবা প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং জনসেবার মান উন্নয়নের প্রত্যাশা নিয়ে ভোটাররা সম্ভাব্য প্রার্থীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন। সব মিলিয়ে অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন এক নির্বাচনি আবহ তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া আগামী মাসগুলোতে দেশের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিধিতে যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে : টানা ঈদের ছুটি শুরুর আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, আচরণ বিধিমালা এবং নির্বাচনি প্রতীক সংরক্ষণ আইন সংশোধনের কাজ অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে ইসি। এ বিষয়ক কমিটি দুদফা বৈঠকও করেছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খসড়া প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন।
ঈদের ছুটি শেষে এখন বিধিমালা সংশোধনের এই কাজই জোরদার করেছে ইসি। খসড়া হাতে পেলে কমিশন বৈঠক করে চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। তবে সব কিছু চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোসহ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামতও নেবে ইসি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রতীক বিধিমালায় সংশোধনী এনে স্থানীয় নির্বাচনে সংরক্ষিত প্রতীকের সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে, কয়েক ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে এসব নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাদ দেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনের বাইরে থাকবে আওয়ামী লীগ : প্রস্তাবিত আচরণবিধি চূড়ান্ত হলে সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর প্রার্থী হওয়ার পথ বন্ধ হতে যাচ্ছে। কারণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ দলগুলোর নেতাকর্মীরা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, সেজন্য নির্বাচন আচরণ বিধিমালাগুলোতে নতুন বিধি যুক্তের প্রস্তাব করেছে ইসি। প্রস্তাবিত ঐ বিধিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীকে নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই—এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অঙ্গীকারনামায় সঠিক তথ্য না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ইসির। ফলে পদধারী আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীর নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় সংসদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো কাপড় ও চটের তৈরি ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে। প্রার্থী ও প্রতীকের ছবি থাকবে। বিলবোর্ডের মাধ্যমেও প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। সে ক্ষেত্রে ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা যাবে। অন্যান্য সংশোধনীর মধ্যে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটারের সমর্থন যুক্ত তালিকা বাদ যাচ্ছে। অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়টি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নির্বাচনি প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা যাবে। অনেকটা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা যেভাবে হলফনামা জমা দেন তার আদলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের হলফনামা করার চিন্তা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ও প্রার্থিতা ঘোষণা : বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ইতিমধ্যে এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তাদের পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে সয়লাব হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অলিগলি ও জনসমাগমস্থল। নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এসব প্রার্থী। ভোটারদের মনোযোগ টানতে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জোর দিচ্ছেন তারা। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর দলীয় পূর্ণ শক্তি নিয়ে সবাই (নেতাকর্মী) ভোটের মাঠে নামবে। সরকারের কার্যক্রমের সফলতায় জাতীয় নির্বাচনের সাফল্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়বে বলে মনে করেন বিএনপির এ সিনিয়র নেতা। এদিকে, ইতিমধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনে জামায়াতে ইসলামী তারণ্য নির্ভর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটির সম্ভাব্য নামও ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব যোগ্যতায় কিছু এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ১০ মে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা ও রাজনীতির বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে এই প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের আরো ১০০ উপজেলার প্রার্থী ঘোষণা করতে যাচ্ছে এনসিপি।

