দুর্নীতির অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত হচ্ছে হুয়াওয়ে

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ১৩:০৪

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ফাইভ-জি উপযোগী অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং টেন্ডার নিয়ম ভাঙার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে সরকারি ক্রয় নিয়ম ঠিকমতো মানা হয়নি এবং এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়েছে।

একইসঙ্গে এ ঘটনায় প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা, পরামর্শক, মূল্যায়ন কমিটির সদস্য এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

 এছাড়া হুয়াওয়ের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)-কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

প্রকল্পে দরপত্র ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরকারি অর্থের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। দুদকের নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল সূত্র একটি গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে: দরপত্রের বিনির্দেশ প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য বিটিসিএল ট্রান্সমিশনের (পশ্চিম) মুখ্য মহাব্যবস্থাপক এ এস এম রেজাউল করিম, মহাব্যবস্থাপক-২, ট্রান্সমিশন (পূর্ব) মো. শফিকুর রহমান, উপমহাব্যবস্থাপক (ওএনএম-১) মো. রেজাউর রহমান আকন্দ, সহকারী ব্যবস্থাপক (ট্রান্সমিশন পূর্ব) মো. সাব্বির আহমেদ, সহকারী ব্যবস্থাপক (ট্রান্সমিশন পূর্ব) সুমন বড়ুয়া, উপমহাব্যবস্থাপক (আইসিএক্স) শেখ মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ কমিটি ও উপমহাব্যবস্থাপক (অবকাঠামো) সদস্য মোছা, তসলিমা আখতার, দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ কমিটি ও ম্যানেজার সদস্য মেহেদী হাসান কবির, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল মতিন, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড ও আহ্বায়ক মো. আজম আলী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান, টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) এ কে এম আমিরুল ইসলাম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব (কোম্পানি) রাশিদা ফেরদৌস, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা) মো. তৈয়বুর রহমান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপসচিব (পরকিল্পনা-৩) মো. আবদুর রব, ৫জির উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মনজির আহমদ, প্রকল্পের সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. ফোরকান উদ্দিন, এএসপি (মেইনটেন্যান্স) মোহাম্মদ জহির রায়হান সাদি, বিটিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (সংগ্রহ) মো. আসলাম হোসেন, ৫জি রেডিনেস প্রজেক্টের উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) সাইদুর রহমান, বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক এ সত্য প্রসাদ মজুমদার, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুক আহমেদ, অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ আলতাফ-উল-আলম, একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা মো. আমিনুল হক, সিপিটিইউয়ের রিভিউ প্যানেলের সভাপতি মো. এনামুল কবীর, সিপিটিইউয়ের রিভিউ প্যানেলের সদস্য সৈয়দ এনায়েত হোসেন, সিপিটিইউয়ের রিভিউ প্যানেলের আরেক সদস্য আবুল কাশেম খান, ‘৫জির উপযোগী অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক’ প্রকল্প এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন শিব্দকী, ৫জির উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম, প্রকল্পের আরেক সদস্য সাইফুল ইসলাম, প্রকল্পের সদস্য সচিব মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্পের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সদস্য মো. হাসানুল মতিন, প্রকল্পের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সদস্য (যুগ্ম সচিব) মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন, বুয়েটের অধ্যাপক ও প্রকল্পের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সদস্য ড. মো. মোস্তফা আকবর, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব ও প্রকল্পের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সদস্য মো. মজিবর রহমান, প্রকল্পের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সদস্য এ এফ এম আনজুমান কালাম, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যোগাযোগ উইংয়ের উপপ্রধান এবং প্রকল্পের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সদস্য মো. মাহবুবুল আলম সিদ্দিকী, বুয়েটের প্রফেসর ও প্রকল্পের স্বতন্ত্র কারিগরি কমিটি সদস্য ড. খালেদ মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও প্রকল্পের স্বতন্ত্র কারিগরি কমিটি সদস্য ড. শফিউল আলম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

জানা যায়, মাত্র ২৬ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথের চাহিদার বিপরীতে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কিনে রাষ্ট্রের ৩২৬ কোটি টাকা অপচয়ের আয়োজনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সুপারিশ, এমনকি দুদকের স্পষ্ট আপত্তি উপেক্ষা করে অপ্রয়োজনীয় এই যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত থেকে অপ্রয়োজনীয় মালামাল বাংলাদেশের কাছে বিক্রির সব আয়োজন সম্পন্ন করে হুয়াওয়ে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটির মূল নকশা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের ব্যান্ডউইথ চাহিদা ধরা হয় ২৬ টেরাবাইট। পরবর্তী সময়ে সেই চাহিদা পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকৃত চাহিদার তুলনায় এ সক্ষমতা অস্বাভাবিক এবং এর ফলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণে অর্থ বিদেশে চলে যাবে।

টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের (পিপিআর) একাধিক বিধান লঙ্ঘন করেছে হুয়াওয়ে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যায়ন কমিটি দরপত্রে জমা দেওয়া নথির বাইরে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করেছে এবং টেন্ডার নথির বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও একটি দরদাতাকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। 

দুদকের ভাষ্য, এতে পিপিআর-২০০৮-এর একাধিক বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ফ্যাক্টরি প্রোডাকশন অ্যাকসেপটেন্স টেস্ট (এফপিএটি) সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো যন্ত্রপাতি জাহাজীকরণের আইনগত কোনো ভিত্তি নাই। কিন্তু হুয়াওয়ের অনৈতিক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের নির্দেশনার আলোকে এফপিএটি সম্পন্ন হওয়ার আগেই জাহাজীকরণের সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং হুয়াওয়ে সেই সুবিধা গ্রহণ করে ফ্যাক্টরি পরীক্ষা ছাড়াই পণ্য বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। সরঞ্জাম বন্দরে এনেই ১০০ কোটি টাকার জন্য বাংলাদেশি একটি ব্যাংককে চাপ দিতে থাকে হুয়াওয়ে। প্রকল্পে অনিয়ম হওয়ায় গতকাল পর্যন্ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই টাকা ছাড় করেনি। তবে ব্যাংকটির ম্যানেজার নানামুখী চাপে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে এমন কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। সেক্ষেত্রে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের বিভিন্ন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। 

প্রতিবেদনে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে, তিনি হুয়াওয়ের অনুকূলে এমন কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, যা টেন্ডার দলিল ও চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। অনুসন্ধানকারী দল মনে করেছে, এসব নির্দেশনার ফলে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিক সুবিধা পেয়েছে। এছাড়াও এই ধরনের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য তিনি হুয়াওয়ের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে আর্থিক অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন-এমন অভিযোগেরও সত্যতা মিলেছে। 

টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কর্মকাণ্ড নিয়ে দুদকের অনুসন্ধানকারী দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যায়নের সময় বাহ্যিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ, টেন্ডার নথির বাইরে যোগাযোগ এবং শর্ত পূরণ না করা দরদাতাকে যোগ্য বিবেচনার করা ছিল বিধিবহির্ভূত, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

দুদকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রকল্পে যন্ত্রপাতির সক্ষমতা নির্ধারণ, দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি বাস্তবায়ন ও সরঞ্জাম গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একাধিক পর্যায়ে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

অনুসন্ধানকারী দল সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, দণ্ডবিধি এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি হুয়াওয়ের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিটিসিএল ও হুয়াওয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ প্রযোজ্য হবে। পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ৬৪ (৬) এ “কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন ক্রয়কারীর সহিত সম্পাদিত চুক্তির কোনো মৌলিক শর্ত ভঙ্গ করিলে বা এই আইন ও বিধির সহিত সংগতিপূর্ণ নহে এইরূপ কোনো কার্যসম্পাদন করিলে, ক্রয়কারী, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিকে চুক্তি বাতিল করিতে পারিবে এবং উক্ত ব্যক্তি, ঠিকাদার, সরবরাহকারী বা পরামর্শককে উপ-ধারা (৫) অনুযায়ী, বিধি দ্বারা নির্ধারিত মেয়াদ উল্লেখক্রমে, সকল সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য বলিয়া ঘোষণা করিতে পারিবে।”

এই প্রেক্ষাপটে দুটি সুপারিশ করে দুদক জানিয়েছে, হুয়াওয়ে কর্তৃক পাবলিক প্রকিউরমেন্ট পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ৬৪ ও পিপিআর-২০০৮ এর বিধি ১২৭ অনুযায়ী পেশাগত অসদাচরণ, অপরাধ, চুক্তি বাতিল ইত্যাদি পর্যায়ভুক্ত অপরাধ বিধায় চুক্তি বাতিল করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিটিসিএল; মহাপরিচালক, সিপিটিইউ (বিপিএএ) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ ও হুয়াওয়ে কর্তৃক পাবলিক প্রকিউরমেন্ট পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ৬৪ ও পিপিআর-২০০৮ এর বিধি ১২৭ অনুযায়ী পেশাগত অসদাচরণ, অপরাধ, চুক্তি বাতিল ইত্যাদি পর্যায়ভুক্ত অপরাধ বিধায় কালো তালিকাভুক্ত করার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিটিসিএল; মহাপরিচালক, সিপিটিইউ (বিপিএএ) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণের সুপারিশ।

জানা যায়, হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে বেশকিছু অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ক্রয় প্রক্রিয়ার গোপন তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার: হুয়াওয়ে টেন্ডার মূল্যায়ন ও অনুমোদন-সংক্রান্ত এমন কিছু তথ্য তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে, যেগুলো সাধারণভাবে গোপন তথ্য হিসেবে বিবেচিত। দুদকের অনুসন্ধানকারী দলের মতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া এসব তথ্য জানার সুযোগ ছিল না।

টেন্ডার মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হুয়াওয়ে বিভিন্ন চিঠিপত্র ও যোগাযোগের মাধ্যমে চলমান ক্রয় প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। অনুসন্ধানকারী দলের মতে, এটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) ২০০৬-এর সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের শামিল।

অনৈতিক যোগাযোগ: হুয়াওয়ে আইনগত আপত্তি বা নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেছে এবং সেই যোগাযোগের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

ফ্যাক্টরি পরীক্ষা ছাড়াই সরঞ্জাম জাহাজীকরণ: প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এফপিএটি সম্পন্ন হওয়ার আগে সরঞ্জাম জাহাজীকরণ করার সুযোগ হুয়াওয়ে পেয়েছে এবং সেই সুবিধা গ্রহণ করেছে। দুদকের অনুসন্ধানকারী দল এটিকে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ বলে মনে করছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ: প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে হুয়াওয়ে সুবিধা নিয়েছে বলে অনুসন্ধানকারী দলের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষ করে এফপিএটি ছাড়াই সরঞ্জাম জাহাজীকরণ ও চুক্তির শর্ত পরিবর্তনের প্রসঙ্গে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

এর আগে, গত ৪ জুন হুয়াওয়ে বাংলাদেশের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস (হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়া) অফিসার তানভীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে গতকাল এক প্রশ্নের জবাবে তানভীর আহমেদের বলেন, ‘আপনি দুদকের যে তদন্ত প্রতিবেদনের কথা বলছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত নই। আজ অবধি দুদক থেকে কোনো যোগাযোগও হুয়াওয়ের সঙ্গে করা হয়নি। যে কোনো দুর্নীতির প্রতি হুয়াওয়ে কঠোর শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখে। ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে একটি আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা দেশের ডিজিটাল রূপান্তর যাত্রায় অবদান রেখে চলেছি।’

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে হুয়াওয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। হুয়াওয়ের বক্তব্য জানতে দুদক তাদের চিঠি দেয়। পরে হুয়াওয়ে কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য পাঠায়।

ইউনূসের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে যত প্রমাণ: অনুসন্ধানে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে ক্রয় প্রক্রিয়া এবং দুদকের চলমান অনুসন্ধানকে প্রভাবিত করার প্রমাণ মেলার কথা জানিয়েছে দুদক। 

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, তিনি চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সঙ্গে বিটিসিএলের চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এফপিএটি সম্পন্ন না করেই পণ্য জাহাজীকরণ এবং এলসির বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেন। দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায়- ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বৈআইনি কাজ করেন ফয়েজ তৈয়্যব। যার মধ্যে রয়েছে, বাতিল হওয়া সরকারি আদেশ (জিও) ফের জারির জন্য প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো, যার উদ্দেশ্য ছিল এফপিএটি সম্পন্ন করে জাহাজীকরণের মাধ্যমে মালপত্র এনে অর্থ পরিশোধ করা। 

তবে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন না পেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে দুদক ও দুদক চেয়ারম্যানকে অবহিত করে পত্র পাঠানো হয়, যেখানে এফপিএটি সম্পন্নের উদ্যোগ চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়, যা মিথ্যা ও অসত্য তথ্য। 

এদিন দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে মৌখিক অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করেন ফয়েজ তৈয়্যব। তবে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। দুদককে চিঠিতে বিষয়টি আইনসংগত নয় বলে জানানো হয়। এরপর ফয়েজ তৈয়্যব এফপিএটি ছাড়াই পণ্য জাহাজীকরণ এবং এলসির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরির জন্য হুয়াওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে নির্দেশনা প্রদান করেন এবং এফপিএটি-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী ব্যর্থতার কারণ গোপন রাখেন। এরপর ২২ জুন ২০২৫ তারিখে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর আধাসরকারিপত্র (ডিও লেটার) পাঠিয়ে অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত ও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন তিনি।

দুদক বলছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং যোগসাজশের মাধ্যমে নিজে বা অন্যকে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া চীনে এফপিএটি সম্পন্নের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগের মধ্যেই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে গত বছরের ৪ মে একটি সরকারি আদেশ জারি করা হয়। 

সেখানে বলা হয়, ‘আইসিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার, এআই অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ম্যানেজমেন্ট’ খাতে অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে ২০২৫ সালের ৬-১০ মে পর্যন্ত চীন সফরের অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। এ ভ্রমণের সব খরচ চায়নিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন মেম্বারস ইন বাংলাদেশ (সিইএবি) বহন করবে। তবে ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দরদাতা এবং পরবর্তী সময়ে কার্যাদেশ প্রাপ্ত হুয়াওয়ে চীন ভ্রমণের ব্যয় বহনকারী সংস্থা সিইএবির সদস্য।

একই প্রকল্পের দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অর্থায়নে বিদেশ সফরের বিষয়টি স্বার্থের সংঘাত। এসব কর্মকাণ্ডকে পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ৬৪ এবং পিপিআর-২০০৮ এর বিধি ১২৭ অনুযায়ী ‘পেশাগত অসদাচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিধির ১২৭(৮) অনুযায়ী এমন অপরাধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তাই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দুর্নীতি দমন কমিশন দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা) এবং ৫১১ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটনের দায়ে মামলার সুপারিশ করেছে।

এ বিষয়ে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে মিলেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ৪১ জনকে চিহ্নিত করে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করে হুয়াওয়েকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে অনিয়ম করে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে রাখায় বিটিসিএলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিটিসিএল চাইলে ক্ষতিপূরণ আদায়ে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। এছাড়া পরবর্তী সময়ে আমাদের তদন্তে হুয়াওয়ের যেসব কর্মকর্তা এতে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলবে, তাদেরও অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এর আগে, গত বছরের ৬ জুলাই একটি সংবাদমাধ্যমে ‘দুদককে থামিয়ে দিতে বিশেষ সহকারীর চিঠি, দেড়শ কোটির প্রকল্পে ব্যয় ৩২৬ কোটি’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি ‘বিতর্কিত প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা ছাড়ে ব্যাংক ম্যানেজারকে চাপ, অনিয়ম-দুর্নীতি’ শীর্ষক আরও একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়। দুটি সংবাদেই এ প্রকল্পের নানান অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়।

তথ্যসূত্র: কালবেলা

ইত্তেফাক/এনটিএম