জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য বড় ধরনের সুখবর নিয়ে আসছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য বিদ্যমান বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই বিশেষ সুবিধাটি আগামী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য পুরোপুরি প্রযোজ্য হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনা করে দেশে প্রথমবারের মতো আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি আয়কর রোডম্যাপ বা কর কাঠামোর আগাম পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছে প্রশাসন। করদাতাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ও করহার আগাম নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে এবারের নতুন বাজেটে।
এনবিআর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশদ বিবরণী অনুযায়ী দেশের করদাতারা যাতে ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বাজেটে তুলে ধরা হচ্ছে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থাকার পর পরবর্তী দুই করবর্ষ অর্থাৎ ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ করবর্ষে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হবে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চূড়ান্ত ধাপে ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাধারণ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি সমাজে পিছিয়ে পড়া ও বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও এই করমুক্ত আয়ের সীমা ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর একটি মানবিক প্রস্তাব রাখা হয়েছে এবারের নতুন বাজেটে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশিায়ী প্রবীণ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা প্রথম দুই করবর্ষে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, পরবর্তী দুই করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে একলাফে ৫ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা এবং সমাজে বসবাসকারী প্রতিবন্ধী করদাতাদের জন্য এই বিশেষ সীমাটি তিন ধাপে যথাক্রমে ৫ লাখ টাকা, ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে অবদান রাখা বীর সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য এই বাজেটে বড় ধরনের কর ছাড়ের সুবিধা রাখা হয়েছে।
নতুন তালিকা অনুযায়ী তাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা প্রথম দুই করবর্ষে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, পরবর্তী দুই করবর্ষে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করার বিশেষ প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি মানবিক দিক বিবেচনা করে দেশে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা-মা কিংবা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্যও বিশেষ করছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে প্রতি প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের জন্য অভিভাবকেরা অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত হিসেবে ভোগ করতে পারবেন।
বাজেটে করমুক্ত আয়ের এই নতুন সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের জন্য কর আদায়ের একটি সুনির্দিষ্ট আগাম হার বা ট্যাক্স স্ল্যাবও চূড়ান্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
নতুন এই কর কাঠামোতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ করদাতাদের সুরক্ষায় বিদ্যমান প্রগতিশীল করব্যবস্থা বহাল রাখা হলেও দেশের উচ্চ আয়ের বিলাসী ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি কর আরোপের একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নিয়মের কর কাঠামো অনুযায়ী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে কোনো করদাতার প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হবে না। এর পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ হারে আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবমিলিয়ে কোনো নাগরিকের বার্ষিক আয় ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে তাকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে এবং যদি কোনো ব্যক্তির বার্ষিক আয় এই সীমা অতিক্রম করে, তবে অবশিষ্ট অতিরিক্ত আয়ের ওপর সরাসরি ৩০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

