আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার

ভারতে জন্মহার প্রথমবারের মতো কমছে, কিন্তু কারণ কী

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১৯:১১

ভারতে প্রথমবারের মতো প্রজনন হার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয় সীমার নিচে নেমে গেছে। একসময় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরিচিত দেশটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি সংকুচিত হতে পারে, প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়তে পারে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসতে পারে।

সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে একজন নারী গড়ে ১ দশমিক ৯টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন অন্তত ২ দশমিক ১। ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনারের কার্যালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (এসআরএস) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে বর্তমানে নারীপ্রতি গড় প্রজননহার (টিএফআর) কমে ১ দশমিক ৯-এ দাঁড়িয়েছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন হার ২ দশমিক ১। সাধারণত একজন নারী তার জীবনে গড়ে কতজন সন্তানের জন্ম দেবেন বলে আশা করা হয়, তাকেই ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ বা টিএফআর বলা হয়। ২০০০ সালের দিকেও ভারতে এই হার ছিল নারীপ্রতি গড়ে ৩ দশমিক ৩।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রসার, নারীদের ক্ষমতায়ন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা এবং সন্তান লালনপালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় জন্মহার কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। পাশাপাশি শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়ায় পরিবারগুলো আগের তুলনায় কম সন্তান নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে।

ভারতের সামাজিক নীতি নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহা বলেন, ‘সমাজে যখন নারীরা বেশি শিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সুবিধা এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান, তখন সাধারণত মোট প্রজনন হার কমে যায়। একই সঙ্গে অর্থনীতি ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে সন্তান লালন-পালনের খরচও বৃদ্ধি পায়, যা জন্মহার কমিয়ে দেয়।’ তার মতে, শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ।

সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে প্রতি ১ হাজার জীবিত শিশুর বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল ৩০, যা ২০২৪ সালে কমে ২৪–এ দাঁড়িয়েছে। ফলে পরিবারগুলো আগের মতো বেশি সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছে না। তবে এই পরিবর্তন দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে ঘটছে না। প্রজনন হারে স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে।

মে মাসে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্যগুলোতে যেমন উত্তর ভারতের বিহারে শিক্ষার হার সবচেয়ে কম এবং শিশুমৃত্যুর হার বেশি। ফলে সেখানে দেশের সর্বোচ্চ প্রজননহার (২.৯) দেখা গেছে। এরপরই রয়েছে উত্তর প্রদেশ (২.৬)।

অন্যদিকে বিপরীতে শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা নয়াদিল্লিতে এই হার মাত্র ১.২। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালায় প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ১.৩।

দীপা সিনহার মতে, ১৯৮০-এর দশক থেকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। নিম্ন প্রজনন হারের পেছনে এটিই প্রধান কারণ।

ভারত ২০০৫ সালে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধার যুগে প্রবেশ করে। এটি এমন একটি সময়, যখন কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এই সুবিধাজনক সময়কাল ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

এই সময়ে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেশি থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। তবে জন্মহার কমতে থাকলে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।

দীপা সিনহা বলেন, ‘যদি কম শিশু জন্ম নেয়, তাহলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর পর ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে। তারা শ্রমবাজারে ততটা অংশ নিতে পারবেন না। এতে দেশের কর্মশক্তির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।’

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রজননহারের বিশাল পার্থক্যের অর্থ হলো উত্তরের রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যা ইতিমধ্যেই বেশি এবং আগামী বছরগুলোতে ভারতের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই সেখানকার বাসিন্দা হবে।

দীপা সিনহার মতে, দক্ষিণের রাজ্যগুলো ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের কম তহবিল দিয়ে ‘শাস্তি’ দিচ্ছে, বিশেষ করে মোদি সরকারের আমলে এই প্রবণতা বেড়েছে।

জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বণ্টন বা ‘ডিলিমিটেশন’ হলে উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে, আর দক্ষিণ ভারতের অংশ কমে যেতে পারে, যা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ককে জটিল করতে পারে।

এ ছাড়া ভারতে জনসংখ্যা নিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিও নতুন কোনো বিষয় নয়। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এই প্রচার চালাচ্ছে, হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের সন্তানসংখ্যা বেশি। তবে সরকারি তথ্য বলছে, মুসলিমদের প্রজননহার অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত কমছে। ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের প্রজননহার ৪ দশমিক ৪১ থেকে কমে ২ দশমিক ৩৬ হয়েছে। হিন্দুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে ১ দশমিক ৯৪ হয়েছে।

সর্বশেষ জরিপে আরও দেখা গেছে, দেশের সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই জন্মহার দ্রুত কমছে।

ভারত সরকার প্রজননহার হ্রাসের সমস্যা মোকাবিলায় এখনো দেশব্যাপী কোনো নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কয়েকটি রাজ্যে দেখা গেছে, সরকার মানুষকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করছে। গত মাসে অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ঘোষণা করেছে, কোনো পরিবারে তৃতীয় সন্তান জন্ম নিলে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান জন্ম নিলে ৪০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এসআরএস তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির মোট প্রজনন হার বর্তমানে ১ দশমিক ৪।

এ ছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো বিভিন্ন রাজ্যে প্রথমবারের মতো মা–বাবা হতে চাওয়া দম্পতিদের জন্য সরকারি অর্থায়নে আইভিএফ কেন্দ্র চালু করেছে।

দীপা সিনহার মতে, মানুষের ব্যক্তিগত প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে সম্মান করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য তাদের জনমিতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের ভিত্তিতে জননীতি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে যাচ্ছি, তাহলে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষের সহায়তার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

তার মতে, এখনই এমন নীতি প্রয়োজন, যা প্রবীণদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

শুধু ভারত নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশও দ্রুত কমে যাওয়া জন্মহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রজনন হার ১, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২ দশমিক ১-এর অনেক নিচে। তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট প্রজনন হার প্রায় ০.৮৬ এবং তা আরও কমতে পারে। 

অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্য বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা মাত্র ০.৭৫, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন উর্বরতার হার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে গেছে। একদিকে কমছে জন্মহার, অন্যদিকে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে সমাজ।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে ভারতের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং রাজনীতি এই পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা সফলভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেটিই আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসজেএস