পেটের মেদ ও স্থূলতা বর্তমানে পুরুষদের জন্য একটি উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে সাধারণত মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের মধ্যেই ভুঁড়ির প্রবণতা বেশি দেখা যেত, কিন্তু এখন তরুণরাও এ সমস্যার শিকার হচ্ছেন। অতিরিক্ত মেদ শুধু শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিও সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এ সমস্যার প্রধান কারণ।
পেটের মেদ স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি
শুধু দেখতে খারাপ লাগে বলেই পেটের মেদ ক্ষতিকর নয়; এটি শরীরের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত ভুঁড়ি থাকলে হৃদযন্ত্রের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার এবং কিডনির বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসকদের মতে, কোমর ঘিরে থাকা অতিরিক্ত চর্বি শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে।
খাবারের অনিয়মে বাড়ছে পেটের চর্বি
ভুঁড়ি বা পেটের মেদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আমাদের প্রচলিত খাদ্যতালিকায় ভাত, রুটি ও অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটজাত খাবারের আধিক্য থাকলেও প্রোটিনের ঘাটতি দেখা যায়। এই অসম খাদ্যাভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে সঞ্চিত হয়ে ধীরে ধীরে চর্বিতে পরিণত হয় এবং মেদ বাড়ায়।
এছাড়া দিনে কয়েকবার মিষ্টি চা, বিস্কুট, কোমল পানীয় বা বিভিন্ন ধরনের হালকা নাসতা খাওয়ার অভ্যাসও ওজন বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। এসব খাবারে প্রচুর চিনি ও অতিরিক্ত ক্যালোরি থাকে, যা শরীরে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমাতে সাহায্য করে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
আধুনিক জীবনযাত্রায় অধিকাংশ কর্মজীবী পুরুষ দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন। অফিস, যানজট এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারার কারণে শরীরচর্চা বা হাঁটাচলার সুযোগ অনেক কমে গেছে। ফলে শরীরে যে পরিমাণ ক্যালোরি প্রবেশ করছে, তার তুলনায় অনেক কম ক্যালোরি খরচ হচ্ছে। নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া না থাকলে অতিরিক্ত ক্যালোরি পেটের চারপাশে জমা হয়ে ভুঁড়ি তৈরি করে। তাই স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখতে প্রতিদিন সক্রিয় থাকা অত্যন্ত জরুরি।
দেরিতে রাতের খাবার খাওয়া
আমাদের সমাজে রাতের খাবার অনেক সময় দেরিতে খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকে রাত ১০টা বা ১১টার পর খাবার খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমাতে যান। এতে খাবার ঠিকমতো হজম হওয়ার সুযোগ পায় না এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, রাতের খাবার যতটা সম্ভব সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে শেষ করা উচিত। এতে হজম ভালো হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
মানসিক চাপ ও ঘুমের সঙ্গে স্থূলতার যোগসূত্র
স্থূলতার কারণ শুধু অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস নয়; মানসিক চাপ এবং ঘুমের ঘাটতিও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপে থাকলে শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, ফলে ক্ষুধা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে চর্বি জমতে শুরু করে। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ওজন নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে। তাই সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।
যেভাবে পেটের মেদ কমাবেন
পেটের মেদ কমাতে প্রথমেই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিদিনের খাবারে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ বা পনিরের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। চিনি, মিষ্টি পানীয় এবং জাঙ্ক ফুড যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পদক্ষেপ হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পাশাপাশি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ দিন নিয়মিত ব্যায়াম করুন। পর্যাপ্ত পানি পান, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া এবং সময়মতো ঘুমানোও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, ইন্ডিয়া টুডে,মায়ো ক্লিনিক

