রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সংকটের কারণে পাহাড়ের চূড়ায় একটি আমগাছে উঠে অনলাইনে নিজের দাপ্তরিক হাজিরা দিয়েছেন এক প্রাথমিক শিক্ষক।
সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকে গাছে উঠে হাজিরা দেওয়ার এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তা ভাইরাল হয়। ওই শিক্ষক বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম ভারত সীমান্ত সংলগ্ন পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলে জানা গেছে।
সরকারি নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে নিজ নিজ বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতার ছবি তুলে তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠাতে হবে। এরপর সেই তথ্য জেলা হয়ে ক্রমান্বয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবে।
সোমবার থেকে এই নতুন নিয়ম দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে। আর প্রথম দিনেই নিজের চাকরি বাঁচাতে এবং পরিবারের জীবিকা সচল রাখতে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের উঁচুতে গাছের ডালে অবস্থান নিতে বাধ্য হন ওই শিক্ষক।
পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চাকরি বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হয়েছে, নইলে তার পরিবারের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে যেত।’ তিনি জানান যে তার স্কুলটি পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় তিন থেকে চারশ ফুট নিচু এলাকায় অবস্থিত।
সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে এসে প্রথমে ভবনের ছাদ থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাজিরা খাতার ছবি পাঠানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে তিনি আশপাশের পাহাড়ের চূড়ায় উঠেও মোবাইলের কোনো সংযোগ পাননি। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে একটি আমগাছের মগডালে উঠে কোনোভাবে দুর্বল নেটওয়ার্ক পেয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠাতে সক্ষম হন।
রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী জেলার মোট ৭০৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম দিন ৫৩৮টি স্কুলের শিক্ষকেরা কোনোভাবে হাজিরার তথ্য পাঠাতে পেরেছেন। তবে বাকি ১৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় প্রথম দিনে তাদের কোনো ডিজিটাল হাজিরা রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। কেবল বাঘাইছড়ি উপজেলাতেই ১১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮টি স্কুলের ৮৩ জন শিক্ষকের অনলাইন হাজিরা সংযোগের অভাবে পাওয়া যায়নি বলে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সঞ্চয়ন চাকমা নিশ্চিত করেছেন।
অনলাইন হাজিরা নিয়ে জেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজির আহমদ তালুকদার জানান যে সমতল অঞ্চলের শিক্ষকেরা খুব সহজে এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারলেও পার্বত্য দুর্গম এলাকায় এটি অত্যন্ত দুরূহ। রাঙামাটি জেলার অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো মোবাইল নেটওয়ার্কের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত পৌঁছায়নি, এমনকি জেলা সদরের অনেক এলাকাতেও ঠিকমতো ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। এই বাস্তবতায় পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক দিকটি বিবেচনা করে শিক্ষকদের জন্য এই নিয়মটি বিশেষ শিথিল করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কফিল উদ্দিন সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান যে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং যেখানে সম্ভব সাধারণ এসএমএসের মাধ্যমে শিক্ষকদের হাজিরার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যেসব দুর্গম এলাকা সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে, সেগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে যে নির্দেশনা আসবে, সেই অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার স্কুলগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাহারোলে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৩২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
চাঁদা দাবির অভিযোগে বিএনপির দুই নেতাকে গণপিটুনি, মুচলেকায় মুক্তি