প্রভাবশালী পরিচয়ে চাকরির টোপ, নারী পুলিশ সদস্য ও স্বামীর বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

  • চাকরির প্রলোভনে আড়াই কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
  • টাঙ্গাইল পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ, সাটুরিয়া থানায় মামলা দায়ের
  • নিজেকে দুদকের মহাপরিচালক ও স্ত্রীকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পরিচয়ের অভিযোগ
  • টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিতের আশ্বাস, পরে দেওয়া হয় ভুয়া নিয়োগপত্র
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১৮:১৭

সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে টাঙ্গাইলে কর্মরত এক নারী পুলিশ সদস্য, তার স্বামী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সুমা আক্তার টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানায় প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের একটি চক্র গড়ে ওঠে। চক্রটির নেতৃত্বে টাঙ্গাইল সদর কোর্ট পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল নাজনীন আক্তার রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার স্বামী ওমর ফারুকের নামও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্তরা নিজেদের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের আস্থা অর্জন করতেন। পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সরকারি চাকরি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিতেন।

ভুক্তভোগী সুমা আক্তারের অভিযোগ, তার মেয়েকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এ সময় ওমর ফারুক নিজেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক এবং নাজনীন আক্তারকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পরিচয় দেন বলে তিনি দাবি করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে বিকাশের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা এবং পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে অভিযুক্তদের বাসায় আরও ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। অর্থ গ্রহণের পর ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অঙ্গীকারনামাও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুমা আক্তারের দাবি, পরবর্তীতে তার মেয়েকে একটি নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও যাচাই-বাছাই করে সেটি ভুয়া বলে জানতে পারেন। এরপর টাকা ফেরত চাইলে অভিযুক্তরা সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে সাটুরিয়া ও মানিকগঞ্জে অভিযোগ দায়েরের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একাধিক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অভিযুক্তরা সাত দিনের মধ্যে অর্থ ফেরতের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন করেননি।

এ ছাড়া চাকরি দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আড়াই কোটিরও বেশি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অভিযুক্তদের কাছে এখনো প্রায় দুই কোটি টাকার পাওনা রয়েছে।

সম্প্রতি নাজনীন আক্তার টাঙ্গাইল জেলা কোর্ট পুলিশে কর্মরত রয়েছেন জানতে পেরে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন সুমা আক্তার। অভিযোগে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আত্মসাৎ করা ২৬ লাখ টাকা উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবল নাজনীন আক্তার প্রথমে কিছু বিষয়ে কথা বললেও প্রতারণার অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

অন্যদিকে, ওমর ফারুক অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আপনার যা ইচ্ছা লিখুন। প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দেবো না। যদি কিছু বলার থাকে, তা আদালতেই বলবো।”

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক।

টাঙ্গাইলে কোর্ট ইন্সপেক্টর আজহারুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ কনস্টেবল নাজনীন আক্তারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে সাটুরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করে ছিলেন ভুক্তভোগীরা। মামলাটির নম্বর-১৩, তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং সংশ্লিষ্ট জিআর নম্বর-১৩৭। মামলাটি বর্তমানে আইনানুগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”

ইত্তেফাক/এমএএম