দলবদ্ধ ধর্ষণে অচেতন ৫ বছরের শিশুকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিল চার তরুণ

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০০:০৬

ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পাঁচ বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুকে কদম ফুল দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জঙ্গলঘেরা স্থানে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে নদীতে চুবিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ কাদায় পুঁতে রাখার নির্মম ও পাশবিক ঘটনার নৃশংস বিবরণ সামনে এসেছে। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া চার তরুণই আদালতে হাজির হয়ে নিজেদের দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার এবং আজ বুধবার দুই দফায় আসামিরা ময়মনসিংহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তনয় সাহার আদালতে এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার আরিফ মিয়া (১৯) ও রাকিব মিয়া (২১) ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার বিকেলে মামলার বাকি দুই আসামি মারুফ মিয়া (১৯) ও মো. সাঈম মিয়াও (১৯) ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আদালতে একই ধরনের জবানবন্দি প্রদান করেন।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে নিজ বাড়ির পাশ থেকেই নিখোঁজ হয় পাঁচ বছর বয়সী ওই শিশুটি। স্বজনেরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরবর্তীতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে স্থানীয় লোকজন কংস নদের একটি বাঁকে তল্লাশি শুরু করেন। একপর্যায়ে নদীর তলদেশে কাদার মধ্যে পুঁতে রাখা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ খুঁজে পান তারা। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি শনাক্ত করে নদী থেকে উদ্ধার করেন।

রোববার রাতেই দাফনের প্রস্তুতি হিসেবে নিয়ম অনুযায়ী শিশুটিকে গোসল করাতে নিয়ে যান স্বজনেরা। সে সময় তার স্পর্শকাতর স্থানে গভীর ক্ষত ও আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান তারা। এমন অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে দাফনের প্রস্তুতি বন্ধ রেখে থানায় খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ধোবাউড়া থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এই ঘটনায় সোমবার রাতে নিহত শিশুটির বাবা বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সুনির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ না করা হলেও এলাকার চার তরুণ মারুফ, আরিফ, রাকিব ও সাঈমকে সন্দেহভাজন হিসেবে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছিল।

পুলিশের তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, রোববার বিকেলে শিশুটি যখন বাড়ির বাইরে ছিল, তখন এই চার তরুণ তাকে কদম ফুল দেওয়ার কথা বলে কৌশলে কংস নদের পাড়ে একটি জঙ্গলঘেরা নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে চারজন মিলে শিশুটিকে অবর্ণনীয় ও পাশবিক দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। ধর্ষণের একপর্যায়ে শিশুটি নিস্তেজ ও অচেতন হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে তারা চরম নৃশংসতার আশ্রয় নেয়। তারা অচেতন শিশুটিকে জীবিত অবস্থাতেই কংস নদের পানিতে চুবিয়ে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে এবং পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে মরদেহটি নদীর তলদেশের কাদার মধ্যে পুঁতে রেখে পালিয়ে যায়।

ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান জানান, পাঁচ বছরের শিশুটিকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গতকাল ও আজ দুই দিনে চারজনই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে দায় স্বীকার করেছেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বিজ্ঞ আদালত চারজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেনৎ

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘এই চাঞ্চল্যকর ও জঘন্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত চার অভিযুক্তকেই আমরা দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। মামলাটি যাতে অতি দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে জন্য পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমা দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করে আসামিদের পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নূরুল হক। তিনি জানান, পাঁচ বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর সঙ্গে এমন বর্বর ও নৃশংসতম ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, সেই অপরাধীদের পক্ষে কোনো আইনজীবী যেন আদালতে আইনি লড়াইয়ে অংশ না নেন, সে জন্য সমিতির সব সদস্যকে কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আজ বুধবার বিকেলে ভুক্তভোগী ও শোকার্ত শিশুটির পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তাদের বাড়িতে যান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ। তিনি নিহত শিশুটির মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নিজের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানান। এই সময় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে এমরান সালেহ বলেন, ‘শিশুটির ওপর সংঘটিত এই নির্মম, বর্বর ও অমানবিক ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। এই নৃশংস ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এমন পাশবিকতা গোটা সমাজকে লজ্জিত ও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।’

তিনি আরও জানান, এই ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই তিনি আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। আইনমন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে সংঘটিত শিশুধর্ষণ ও হত্যা মামলার মতোই এই শিশুটির মামলাও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা হবে।

ইত্তেফাক/এনএন