আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত কথিত গুম ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সাবেক বডিগার্ড ও সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। জবানবন্দিতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানান তিনি।
রোববার (২১ জুন) বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। বর্তমানে তিনি রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ সময় অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে মেজর জিয়াউল, মেজর নওশাদ, সাইফসহ মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। কে বা কাকে গাড়িতে তুলবে তা আমি জানতাম না। তবে গাড়িতে বসে জিয়াউল আহসান বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন জানতে টার্গেট কখন আসবেন। একপর্যায়ে জানা যায় টার্গেট আসবেন না। পরে সেখান থেকে জিয়াউল আহসানকে বাসায় নামিয়ে দেই। পরদিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাই। ছুটিতে থাকাকালে ১৮ এপ্রিল বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী থেকে অপহরণ করা হয়।’
সাক্ষী ইমরুল কায়েস আরও বলেন, ‘এরপর ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টারের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে যোগ দেই। যোগদানের পর কর্মস্থলে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি। এছাড়া সাধারণত প্রতিদিন সকাল ৯টায় রোল-কল হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিলের পর সকাল ৭টায় হয়েছিল। এভাবে বেশ কয়েকদিন সকালে আসতেন জিয়াউল আহসান।’ তিনি বলেন, ‘একদিন ফোনে কথা বলছিলেন জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে তার আরেকটি ফোনে কল আসে। তখন জিয়া সার বলছিলেন, ‘তুই রাখ’। তারিক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী) ফোন দিয়েছেন।’
ফোনে জিয়াউল ও তারিক স্যারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়—উল্লেখ করে সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে জিয়াউল স্যার বলে ওঠেন—আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেন।’
এছাড়া ইলিয়াস আলীকে গুমের পর অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল র্যাব হেডকোয়ার্টারের বেশ কিছু সিসিটিভির ফুটেজ ধ্বংস করে ফেলেন বলেও জানানইমরুল। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি এক বছর তিন-চার মাস জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড বা রানার ছিলাম। আমি সে সময় দেখেছি তিনি ওই সময়ে ১৫০/২০০ মানুষকে বিভিন্নভাবে হত্যা করেছেন।’
জবানবন্দি শেষে ট্রাইব্যুনালের কাছে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানান ইমরুল কায়েস।
উল্লেখ্য, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত শতাধিক গুম ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

