স্বর্ণের দোকানে চুরি: চোর প্রবেশের দিক নিয়ে রহস্য

আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ২১:৪০

রাজশাহীতে দুই দোকানের মাঝখানের দেয়াল কেটে একটি জুয়েলারি দোকানে বড় চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু চোর কোন দিক দিয়ে ঢুকেছে, সেটা নিয়েই রহস্য তৈরি হয়েছে। চুরি হয়েছে নগরের সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে। পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্স। দুটি দোকানের তালাই অক্ষত থাকায় চোর ঢোকার পথ নিয়ে রহস্যের জট খুলছে না।

দুই দোকানির কথাবার্তায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক বলছেন, পাশের দোকান থেকে দেয়াল কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে পাশের জুয়েলার্সের মালিক বলছেন, যে দোকানে চুরি হয়েছে, সেদিক দিয়ে তার দোকানের দিকের দেয়াল কাটা হতে পারে।

দুটি দোকানেরই শাটারের তালা অক্ষত থাকায় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরের বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ কবির একটি বেসরকারি গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা দুই দোকানের মালিকের সঙ্গেই কথা বলেছি। কেউই আমাদের সন্দেহের বাইরে নন। তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রুত রহস্য উদ্‌ঘাটন হবে।’

গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে এ চুরির ঘটনা ঘটে। প্রায় ২০ বছর ধরে এ ব্যবসা চালাচ্ছেন নগরের শাহমখদুম কলেজ এলাকার বাসিন্দা তূর্য সরকার ও তার ছোট ভাই ইমন সরকার। তাদের দাবি, চোরেরা দোকান থেকে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ ও ১ হাজার ২০০ ভরি ওজনের রুপার অলংকার এবং ২০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে। চুরি হওয়া স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।

কারুশ্রী জুয়েলার্স তিনতলা একটি ভবনের নিচতলায়। ভবনের নিচতলায় সবই জুয়েলার্সের দোকান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় একটি আবাসিক হোটেল। কারুশ্রীর পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্স। সেটার পাশ দিয়েই আবাসিক হোটেলে ওঠার সিঁড়িতে যাওয়ার পথ। এখানে একটি গেট থাকলেও আবাসিক হোটেলের কারণে তা খোলাই থাকে।

শনিবার সকালেও কারুশ্রী ও আফিয়া জুয়েলার্সের শাটারে সব তালা লাগানোই ছিল। কিন্তু তূর্য সরকারের চাচাতো ভাই মো. শুভ কারুশ্রীর শাটার খোলার পর দেখতে পান সবকিছু এলোমেলো। সিন্দুক ভেঙে স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর কারুশ্রী ও আফিয়া জুয়েলার্সের মাঝে থাকা ইটের দেয়ালের একটি অংশ কাটা। খবর পেয়ে তূর্য ছুটে এসে আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমানকে ফোন করেন। তিনি এসে দেখেন, তার দোকানের শাটারে লাগানো তালা অক্ষত। চাবি দিয়ে তালা খোলার পর দেয়াল কাটা থাকলেও তার দোকানের সিন্দুক অক্ষত ছিল। সিন্দুকে দেড় লাখ টাকা মূল্যের অলংকার ছিল। আফিয়া জুয়েলার্সের ভেতর থেকে কোনো কিছুই চুরি হয়নি।

আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমান বলছেন, ‘আমার দোকান দিয়ে চোর ঢুকলে শাটারের তালা ভাঙা থাকত। চুরির ঘটনা জানাজানির পর আমি এলাম। চাবি দিলাম, তালা খুলে ঢুকল। আমার দোকানের শাটারের তালা যেমন অক্ষত, তেমনি কারুশ্রীর শাটার ও তালা অক্ষত। এমনও তো হতে পারে কারুশ্রীতে চুরির পর চোর দেয়াল কেটে আমার দোকানে ঢুকেছিল। সিন্দুক ভাঙার সময় হয়তো পায়নি। আমি আল্লাহকে বলেছি, ইনশাআল্লাহ রহস্য উন্মোচন হয়ে যাবে। আপনারা সবই দেখতে পাবেন।’

এদিকে চুরির প্রতিবাদে স্বর্ণপট্টির সব জুয়েলার্সের দোকান বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। শনিবার তারা বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন। দুপুরে স্বর্ণপট্টিতে গিয়ে দেখা যায়, কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে অবস্থান করছেন ব্যবসায়ীরা। সেখানে তূর্য সরকার থাকলেও কথা বলতে পারেননি।

তূর্যের ভাই ইমন সরকার বলেন, ‘আমাদের সব মালামাল দোকানেই থাকত। কোনো কিছুই আমরা বাড়িতে নিয়ে যেতাম না। চোর চুরি করে সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআরও নিয়ে গেছে।’ সরাসরি নাম না বললেও ইমনের কথাবার্তায় বোঝা যায়, তিনি পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক-কর্মচারীদের সন্দেহ করছেন। তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেল। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পেলাম না। কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও পুলিশ ধরল না।’

চুরির ঘটনায় শুক্রবার রাতে তূর্য সরকার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া থানায় একটি মামলা করেছেন। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজিউর রহমান রোববার বিকেলে একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশ ছাড়াও সরকারের আরও কয়েকটি সংস্থা একসঙ্গে কাজ করেছে। তারা কিছু তথ্য পেয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করছেন। নিশ্চিত হলেই গণমাধ্যমকে বলা হবে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং চুরি যাওয়া অলংকার উদ্ধারের জন্য তাদের বেঁধে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার সময় পার হয়ে গেছে। পুলিশ কমিশনার আশ্বাস দিয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে। বিষয়টি তারা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।  র‌্যাবসহ অন্য সংস্থাগুলোকেও বলে দিয়েছেন। তারা আজ রাতে তাদের কর্মসূচির ব্যাপারে বসবেন।

ইত্তেফাক/এসএইচ