যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ শহরে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহসহ তার কয়েকজন সহযোগী সাবেক একজন ছাত্রলীগ নেতাকে মারধর করেছেন বলে দেশটির পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের এক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। হাসনাত আবদুল্লাহর কাছেও ঘটনার বিষয়ে পুলিশ জানতে চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে (১৯ জুন) কেমব্রিজ শহরে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের কাছে অভিযোগকারী জুবায়ের আহমেদ বলেছেন, হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার সহযোগীরা তার পথ আটকে মারধর করেছেন। তার তলপেটে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে সেখানে হালকা জখম হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে জুবায়েরের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের এক নেতা। আর সংগঠনটি শনিবার (২০ জুন) এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগ ও পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থকেরা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং তার সফরসঙ্গীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার ও হয়রানির পর এবার নতুন নাটক শুরু করেছে। তারা হাসনাত আবদুল্লাহ, এহতেশাম হক, জাকির চৌধুরী, শাহীন আলমসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে ‘বেধড়ক পেটানোর’ অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য পুলিশের মূল্যবান সময় নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জননিরাপত্তা ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিশেষায়িত সংস্থা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
মামলার বাদী জুবায়ের আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাগারে কর্মরত। পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের জন্য ফুড ডেলিভারির (খাবার সরবরাহ) কাজও করেন। তিনি একসময় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জুবায়ের বলেছেন, ঘটনার দিন তিনি মোটরসাইকেলে করে খাবার সরবরাহের কাজে বের হয়েছিলেন। একপর্যায়ে একটি সাদা রঙের গাড়ি ট্রাফিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে অগ্রাধিকার (গিভওয়ে) না দিয়ে বেপরোয়াভাবে চলে যায়। এর প্রতিবাদ জানাতে তিনি গাড়িটিকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। তখন তিনি জানতেন না যে গাড়িটিতে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ অবস্থান করছিলেন।
জুবায়ের বলেন, কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়িটি রাস্তার মধ্যে থামে। পরে আরেকটি গাড়িও সেখানে এসে দাঁড়ায়। এ সময় এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের নেতা জাকির চৌধুরী তার মোটরসাইকেলের গতি রোধ করেন। এরপর হাসনাত আবদুল্লাহকে বহনকারী গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে এসে তাকে এলোপাতাড়ি কিল–ঘুষি মারেন। আমি তখন হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করি এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা করি। আশপাশের লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
জুবায়ের আরও দাবি করেন, হামলাকারীদের একজনের হাতে ছুরি ছিল এবং তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তার তলপেটের বাঁ পাশে হালকা আঘাত লাগে। ঘটনার পর রক্তমাখা পোশাকসহ তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানান।
জুবায়েরের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা একজন শ্বেতাঙ্গ নারী প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশে ফোন করেন। পরে ওই নারী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পুলিশ গিয়ে তার বক্তব্য নেয় এবং অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করে।
এরপর কেমব্রিজে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের নেতা জাকির চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। পরে বক্তব্য নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশ হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে এই এনসিপি নেতার আইনি সহায়তা দেওয়া একজন আইনজীবী জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পুলিশ হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ঘটনার বিষয়ে তথ্য ও বক্তব্য চেয়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের নেতা জাকির চৌধুরী বলেন, অভিযোগকারী জুবায়ের আহমেদকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন। জুবায়ের প্রায় দুই বছর তার রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন। ঘটনার দিন কেমব্রিজে হাসনাত আবদুল্লাহকে দেখতে পেয়ে জুবায়ের মোটরসাইকেলে করে তাদের গাড়িকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে জুবায়ের তাদের গাড়ির পেছনে পেছনে চলছিলেন। একপর্যায়ে তারা তাকে থামিয়ে জানতে চান, কেন তিনি তাদের অনুসরণ করছেন।
জাকির চৌধুরী দাবি করেন, ওই সময় জুবায়ের তার হেলমেট খুলে হাসনাত আবদুল্লাহর দিকে এগিয়ে যান এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। এ কারণে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে মারধর করা হয়েছে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে—এমন অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
জাকির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা তাকে আক্রমণ করিনি। তাকে শান্ত করার এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। পরে আমরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করি।’
যুক্তরাজ্য পুলিশ ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত করে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্তটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কাছে অনলাইনে একটি বিবৃতি দিয়েছেন বলে জানান জাকির চৌধুরী।
এ ঘটনার তদন্তে অগ্রগতি জানতে চেয়ে আজ রোববার লন্ডন পুলিশকে মেইল করা হয়েছে। এখনো তাদের কাছ থেকে জবাব পাওয়া যায়নি। আর ঘটনার বিষয়ে জানতে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, বিষয়টি দেখভালের জন্য এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এ ঘটনায় একজন শ্বেতাঙ্গ নারীসহ দুজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পুলিশের কাছে বক্তব্য দিয়েছেন। একজনের ভাষ্যমতে, ঘটনাস্থলে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে জুবায়ের আহমেদ নামের ব্যক্তিকে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে তাকে ধাক্কাধাক্কি ও টানাহেঁচড়া করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি কাছাকাছি একটি বাসা থেকে উচ্চ স্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকান। তিনি কয়েকজনকে এক ব্যক্তিকে টানাহেঁচড়া করতে দেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি গতকাল ১৯ জুন শুক্রবার বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটের কিছু আগে ঘটে। পরে হামলাকারীরা গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সাক্ষী দাবি করেছেন, গাড়িটি চলে যাওয়ার আগে তিনি এর রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ছবি তুলতে সক্ষম হন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটির অধীন অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি আয়োজিত একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ১৩ জুন যুক্তরাজ্যে যান হাসনাত আবদুল্লাহ। এখনো তিনি দেশটিতে অবস্থান করছেন।
সূত্র: প্রথম আলো

