টিফিন কিনতে বেরিয়ে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী, নেপথ্যে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ২২:১৮

কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ইথান আহমেদ নামের ষষ্ঠ শ্রেণির এক স্কুলশিক্ষার্থী। টিফিনের বিরতিতে বন্ধুদের সাথে বিদ্যালয়ের বাইরে খাবার কিনতে বের হয়ে সে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ ইথান কাটাবিল এলাকার বাসিন্দা ইউনুস মিয়ার ছেলে।

চিকিৎসক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর বেলা আড়াইটার দিকে ইথানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জানান, শিক্ষার্থীর পিঠে বিদ্ধ হওয়া গুলিটি তার ফুসফুসেও আঘাত করেছে। ঘটনার সময় হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র ফাঁকা না থাকায় তাকে দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঢাকায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পিঠের গুলিটি বের করা হবে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ঘটনার পর থেকেই অপরাধীদের ধরতে তৎপরতা শুরু করেছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাইফুল মালিক জানিয়েছেন, বর্তমানে পুলিশের একাধিক টিমের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও ঘটনাস্থলে কাজ করছে। এই সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করার খবর পাওয়া যায়নি।

কাটাবিল এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই মাদকপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এবং এখানে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বেশ কয়েকটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বুধবার রাত থেকেই স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা শুরু হয়। রাতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, মূলত মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অপু গ্রুপ ও সাব্বির গ্রুপের মধ্যে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

বুধবার রাতের ওই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রতিবাদে এবং এলাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধের দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের ব্যানারে একটি মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মানববন্ধন কর্মসূচিটি শেষের দিকে পৌঁছালে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি সেখানে আচমকা হামলা চালায়। একপর্যায়ে দুই পক্ষই মারাত্মক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে থাকে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই বিদ্যালয় থেকে টিফিনের বিরতিতে বের হওয়া ইথানের পিঠে গুলি লাগে। এই সংঘর্ষে দুই পক্ষের আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ এই হামলায় মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হালিম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে করা মানববন্ধনে এমন বর্বরোচিত হামলা এবং একটি স্কুলপড়ুয়া শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা দ্রুত এই এলাকা থেকে মাদকের সম্পূর্ণ অবসান চান।

এলাকার অন্য এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মাদক বিরোধের অবসান ঘটাতে প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যেন আর কোনো নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়। অন্যদিকে, কিছু বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন যে বুধবার রাতের ঘটনার পর পুলিশ সক্রিয় থাকলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতি ছিল না। রাতেই যদি অপরাধীদের ধরতে মূল অভিযান শুরু হতো, তবে দুপুরের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো বলে তারা মনে করেন। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে থানা সূত্রে জানানো হয়েছে।

সন্তানের এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় ইথানের মা সোনিয়া আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, সকালে তার সুস্থ ছেলেটিকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু দুপুরে তাকে হাসপাতালের শয্যায় দেখতে হলো। কোনো অপরাধ না করেও তার একমাত্র ছেলে যেভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তার জন্য তিনি দায়ীদের কঠোর শাস্তি ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।

ইত্তেফাক/এনএন