হেটমায়ারের সেই বাংলাদেশ

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০১

পাঁচ বছর আগের ডিসেম্বর মাস। যুদ্ধাপরাধের দায়ে কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানার বিরোধিতায় জামায়াতে ইসলামীর ডাকা ৭২ ঘন্টার অবরোধ চলছে সারা দেশে। হরতাল, অবরোধের ওই সময়ে বাংলাদেশ সফরে তখন ওয়েস্টইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সাত ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ১০৪ রানে হারা উইন্ডিজ যুব দলের আবাস চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হোটেলের সামনে ফুটল একটি ককটেল। নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে সফর বাতিল করে দেশে ফিরে গেল ক্যারিবিয়ানরা।

গত বুধবার দুপুরে বিসিবি একাডেমি মাঠে একান্ত আলাপচারিতায় ২০১৩ সালের সেই ডিসেম্বরকে ফিরিয়ে আনলেন শিমরন হেটমায়ার। ককটেল বিস্ফোরণের সময়টাতে আগ্রাবাদ হোটেলেই ছিলেন তিনি। বয়সটা ১৬ ছিল বলেই কিনা নেতিবাচক সেই ঘটনা তার মনে দাগ কেটেছে। তবে ২০১৬ সালে আবার এই বাংলাদেশই গায়ানায় বেড়ে উঠা হেটমায়ারের মনে ভালো লাগার ‘স্থায়ী আসন’ পেয়েছিল। ওই বছর তার নেতৃত্বেই ঢাকায় যুব বিশ্বকাপ জিতেছিল ওয়েস্টইন্ডিজ।

বিশ্বকাপ জয়ের সুখস্মৃতি মনে করতেই হেটমায়ারের চোখে-মুখে খেলে গেল গৌরবের রোমাঞ্চ। বললেন, ‘বাংলাদেশে আসতে পারাটা সবসময়ই আনন্দের। তবে প্রথমবার যখন এসেছিলাম সেই অভিজ্ঞতা তত ভাল ছিল না। এখানে বোম্বিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল। এরপর যখন এসেছি সেটা ছিল স্মরণীয়।  বিশ্বকাপ খেলার  আগে এখানে কয়েকটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছি। এই মাঠটিও (মিরপুর) আমাদের জন্য স্মরণীয়। এখানে আমরা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছি। এছাড়াও কিছু মজার স্মৃতি আছে।’

১১ বছর বয়স থেকেই ক্রিকেট খেলেন এই তরুণ। নিজের ভাইকে দেখেই ক্রিকেটের সঙ্গে ২২ গজকে জীবনের ঠিকানা বানিয়ে নেন। এখন পরিবার, গার্লফ্রেন্ডের সমর্থনে এগুচ্ছে ক্রিকেটের সঙ্গে তার পথচলা। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকেই উইকেটে ব্যাট হাতে স্বাবলীল, ইতিবাচক হেটমায়ার। বয়স বাড়ার সঙ্গে ব্যাটিংয়ে যোগ হয়েছে আত্মবিশ্বাস, ভয়ডরহীনতা। ২১ বছর এই ক্রিকেটার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং নিয়ে বলেছেন, ‘আমি বলবো এটা সহজাত। যে বলটিই আসুক না কেন আমি মনে করি খেলা সম্ভব এবং সবসময়ই আমি আমার সর্বোচ্চ রানটিই করতে চাই।’

ওয়েস্টইন্ডিজের ভবিষ্যতের তারকা ক্রিকেটার হিসেবে এখন হেটমায়ারের নামই বেশি উচ্চারিত হয়। ১০ টেস্ট, ১৭ ওয়ানডে ও ৫ টি-টোয়েন্টিতে নিজের প্রতিভার স্বরূপও তুলে ধরেছেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ওয়ানডেতে তিনটি সেঞ্চুরি করা হেটমায়ার স্বদেশের শিবনারায়ণ চন্দরপল, ক্রিস গেইল, ব্রায়ান লারার ব্যাটিংই অনুসরণ করেন।

বিভিন্ন কন্ডিশনে ব্যাটসম্যান হিসেবে পরীক্ষা দেয়ার পর্বটা শুরু হয়েছে হেটমায়ারের ক্যারিয়ারে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নিজেকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান তিনি। বলেছেন, ‘আমি সমসময়ই নিজেকে অধরা উচ্চতায় দেখতে চাই। কয়েক বছরের মধ্যে যেন বিশ্বমানের ব্যাটসম্যান হতে পারি সেই চেষ্টাই করবো। সেজন্য কঠোর পরিশ্রম করছি যেন ক্রিকেটের প্রতিটি ফরম্যাটেই অন দ্য ফিল্ড এবং অফ দ্য ফিল্ড ইতিবাচক থাকতে পারি।’

এই তো বাংলাদেশ সফরে টেস্ট সিরিজে উইন্ডিজ ব্যাটসম্যানদের সবাই সংগ্রাম করেছেন ২২ গজে। ব্যতিক্রম সেখানে হেটমায়ার। ব্যাট হাতে একমাত্র তিনিই তোপ দাগিয়েছেন বাংলাদেশের বোলারদের উপর। এমন ব্যাটিংয়ের রহস্য জানতে চাইলে বলেছেন, ‘এর পেছনে কোনো রহস্য নেই। আমি মনে করি স্পিন আমি খুবই ভাল খেলি। আমি উইকেটে গিয়ে চাপমুক্ত এবং নির্ভীক থাকি। এই ব্যাপারটিই আমাকে আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে সাহায্য করে।’  

টেস্ট সিরিজটা একতরফা হলেও বাংলাদেশ সফরে ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়াবে ওয়েস্টইন্ডিজ। এই ফরম্যাটে নিজেদের ভালো সুযোগ দেখছেন হেটমায়ারও। তিনি বলেছেন, ‘টেস্ট সিরিজে আমরা ভাল করিনি।  আমার মনে হয় ওয়ানডে সিরিজে আমাদের ভাল সুযোগ আছে। আমাদের ধাপে ধাপে আগাতে হবে। দলের সবাইকে হাল ধরতে হবে এবং দায়িত্ব নিতে হবে।’

তবে বাংলাদেশে হেটমায়ারের সবচেয়ে ভালো বন্ধু মেহেদী হাসান মিরাজ। যুব দল থেকেই পরস্পরের বিপক্ষে খেলে আসছেন। সর্বশেষ টেস্ট সিরিজে চারবার মিরাজের বলে আউট হয়েছেন তিনি। সেই প্রসঙ্গ উঠতেই হাসতে হাসতে বললেন, ‘হ্যাঁ, ও তো আমার ভাল একজন বন্ধু। বাংলাদেশের পুরোনো বন্ধুদের মধ্যেও ও একজন। আমি বলবো ওর বিপক্ষে খেলাটা চ্যালেঞ্জিং। সেই অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব আছে। মাঠে, মাঠের বাইরে ও আমরা ভাল বন্ধু।’ 

ক্লাইভ লয়েড, চন্দরপল, কলিন ক্রাফট, কার্ল হুপারের মতো অনেক কিংবদন্তি ক্রিকেটারের জন্ম গায়ানায়। ক্যারিবিয়ান এই দ্বীপে জন্ম হেটমায়ারের। ক্রিকেট বিশ্বে কিংবদন্তি হওয়ার স্বপ্নটা লালন করেন এই তরুণও। শেষ বেলায় বলে গেলেন, ‘হ্যাঁ, আমি খেলাটার লিজেন্ড হতে চাই।’