তীব্র তাপপ্রবাহে নাকাল ইউরোপ, ফ্রান্সে অতিরিক্ত মৃত্যু প্রায় ১ হাজার

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ১৬:১৯

ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে প্রতিদিনই ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড। এরই মধ্যে ফ্রান্সে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আল্পস অঞ্চল পর্যন্ত একাধিক দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা পাবলিক হেলথ ফ্রান্স জানায়, ২৪ জুন থেকে এ পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মৃতদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি থাকা অঞ্চলগুলো। বিশেষ করে প্যারিস ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস এলাকায় বাসাবাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, একাকী ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের সুরক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তবে প্রকাশিত মৃত্যুর তথ্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।

পোল্যান্ডে পৌঁছে যাওয়া তাপপ্রবাহের মধ্যে রাজধানী ওয়ারশর কেন্দ্রস্থলে একটি ফোয়ারার কাছে স্বস্তি খুঁজছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: এএফপি

গত কয়েকদিন ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলেও রোববার কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।

জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের ময়েকার্ন-ড্রেভিৎস এলাকায় শনিবার ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশটির নতুন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। ডেনমার্কে ১৮৭৪ সালের পর সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রিতে, আর স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভায় ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত পার হয়েছে।

জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছাড়া এমন তীব্র তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, বর্তমানে রাতের অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেড়েছে।

জার্মানির গ্রিন পার্টির সাবেক সংসদীয় নেতা ক্যাটরিন গ্যোরিং-একহার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এটি আর মনোরম গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।’

ইতালির ভেনিসে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে একটি পাবলিক ফোয়ারা থেকে পানি সংগ্রহ করছে মানুষ। ছবি: এএফপি

তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপজুড়ে নানামুখী প্রভাব পড়েছে। জার্মানিতে দেশজুড়ে তাপমাত্রা নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হাঙ্গেরিতে দানিয়ুব নদীর পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন কমানো হয়েছে। একই কারণে সুইজারল্যান্ডের বেজনাউ পারমাণবিক কেন্দ্রও সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

ইতালিতে মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স ও বোলোনিয়াসহ ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। দেশটির প্রধান নদী পো-তে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে, যা কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে।

অতিরিক্ত তাপের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সড়ক ও রেল যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটছে। জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত একটি মহাসড়কে তাপের কারণে ফাটল দেখা দেওয়ায় আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছে। ডয়চে বান যাত্রীদের দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে। একইভাবে কয়েকটি দেশে বড় জনসমাগম ও ক্রীড়া আয়োজনের সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা প্রতিযোগিতার দূরত্ব কমিয়ে আনা হয়েছে।

সার্বিয়াজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে রাজধানী বেলগ্রেডের একটি পানির ফোয়ারা থেকে পানি পান করছে কবুতর। ছবি: এএফপি

অত্যধিক গরমে হামবুর্গের কাছে জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত একটি মহাসড়কের একটি লেনে ফাটল দেখা যাওয়ায় আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সুইজারল্যান্ডে লোজান প্রাইড শোভাযাত্রায় অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। মিলানে প্রাইড মিছিলের সময় পিছিয়ে বিকেল ৫টায় নেওয়া হয়। আর ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিতব্য আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তীব্র গরমের কারণে সাইক্লিং ও দৌড়ের দূরত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’ আকৃতির উচ্চচাপ বলয় বা ‘ওমেগা ব্লক’ সৃষ্টি হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে গরম বাতাস ইউরোপের ওপর আটকে রয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের তুলনায় অনেক বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে। তবে সপ্তাহের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাপপ্রবাহের তীব্রতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

ইত্তেফাক/এসজেএস