সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর এখন হুইল চেয়ারে বসা, হার্ট ও লিভারের অসুখে গুরুতর অসুস্থ। অনেকটা মৃত্যুর মুখোমুখি। কানাডা তাকে বাংলাদেশের কাছে ফেরত না দিলে হয়তো টরন্টোতেই ঘৃণিত খুনি নূরের জীবনের অবসান হবে এবং বাংলাদেশের এই কলঙ্কের কবর থাকবে কানাডায়!
বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি একই সূত্রে গাঁথা। এই চার গর্বিত ‘ব’ আমার কাছে বিস্ময়কর! বঙ্গবন্ধু যেমন হতভাগা, তেমনি তাঁর বাংলাদেশও। বাংলা ভাষা যেমন দুঃখিনী, তেমনি বাঙালি জাতিও দুর্ভাগা!
তাই মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ৩৪ বছর পর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর। খুব ধীরে দীর্ঘ বারো বছরে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে আইনের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছতার সঙ্গে অতিক্রম করে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্বঘোষিত খুনিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে কারাবন্দি পাঁচ আসামির ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ফাঁসি কার্যকর হয়। তারা হলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মুহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ।
এই বিচারের রায় আংশিক কার্যকরের মাধ্যমে দেশ ও জাতি দায়মুক্ত হলো। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয় আসামি পলাতক। তারা হলেন—খন্দকার আবদুর রশিদ, শরীফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন। এদের মধ্যে লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ (বরখাস্ত) লিবিয়া ও বেলজিয়ামে অবস্থান করছেন। বেশিরভাগ সময় লিবিয়াতে থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। লে. কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম (বরখাস্ত) পাকিস্তানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান থেকে হংকংয়ে তার যাতায়াত রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে প্রকাশ। লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী (বরখাস্ত) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে, লে. কর্নেল (অব.) এন এইচ এমবি নূর চৌধুরী (বরখাস্ত) কানাডায় রয়েছেন। অপর দুজন ভারতে কারাগারে আটক বলে জানা গেছে। এরা হলেন ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৭ জানুয়ারি ২০১০, ঢাকা)
আর এদিকে বিদেশে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং একইসঙ্গে তাদের ভিসা ও পাসপোর্ট না দেওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব দেশকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। (২০১২ সালের ২১ নভেম্বরে সচিবালয়ে টাস্কফোর্সের সভা শেষে সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের তথ্য)
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে এদের খোঁজে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল রেড অ্যালার্ট জারি ছাড়াও অপারেশন সার্চলাইট ঘোষণা করে। এদের দেশে ফেরত আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের পৃথক দুটি টিম কাজ শুরু করে এবং ৪৬টি মিশনে অ্যালার্ট দেয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে ইন্টারপোল রেড অ্যালার্টের নোটিস থেকে তাদের নাম মুছে ফেলে।
পুনরায় তাদের নামে আন্তর্জাতিক রেড অ্যালার্ট দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিচারকার্য সম্পন্ন এবং পাঁচ খুনির ফাঁসি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পলাতক খুনিরা আরো বেশি উদগ্রীব ও অস্থির হয়ে ওঠে। দ্রুত পাল্টাচ্ছে অবস্থান। উল্লেখ্য, বাকি একজন আজিজ পাশা মারা গেছেন জিম্বাবুয়েতে। আবার কেউ কেউ বলছেন, খুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই প্রচার করা হচ্ছে।
হত্যাকারী সবাই প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা। ১৯৭৬ সালের ৮ জুন প্রকাশিত এক সরকারি গেজেটের পরিপ্রেক্ষিতে ওরা ১২ জন বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
১. লে. কর্নেল শরীফুল হক ডালিম/ প্রথম সচিব / চীন
২. লে. কর্নেল আজিজ পাশা/ প্রথম সচিব/ আর্জেন্টিনা
৩. মেজর মহিউদ্দিন/ দ্বিতীয় সচিব/ আলজেরিয়া
৪. মেজর শাহরিয়ার রশিদ/ দ্বিতীয় সচিব/ ইন্দোনেশিয়া
৫. মেজর বজলুল হুদা/ দ্বিতীয় সচিব/ পাকিস্তান
৬. মেজর রশিদ চৌধুরী/ দ্বিতীয় সচিব/ সৌদি আরব
৭. মেজর নূর চৌধুরী/ দ্বিতীয় সচিব/ ইরান
৮. মেজর শরিফুল হোসেন/ দ্বিতীয় সচিব/ কুয়েত
৯. ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম/ দ্বিতীয় সচিব/ আবু্ধাবি
১০. লে. খায়রুজ্জামান/ তৃতীয় সচিব/ মিশর
১১. লে. আব্দুল মাজেদ/ তৃতীয় সচিব/ সেনেগাল
১২. লে. নাজমুল হোসেন/ তৃতীয় সচিব/ কানাডা।
(বাংলাদেশ গেজেট, ৮ জুন ১৯৭৬)
‘অনেক দেশ তাদের নিয়োগ মেনে নিলেও ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড কোনো খুনিকে গ্রহণ করেনি। এমনকি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানও একজনকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়’। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ জানুয়ারি ২০১০, ঢাকা)
কানাডায় খুনিদের কথা
উপরের উল্লেখিত ১২ জনের মধ্য পাঁচজনই কানাডায় অবস্থান করছেন। নূর ছাড়াও রয়েছেন নাজমুল, শরাফুল, কিসমত ও খায়রুজ্জামান। লে. নাজমুল হোসেন আনসার ১৯৭৫ সালে কানাডায় তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে খালাস পান। কিন্তু তার নামে জেল হত্যা মামলা আছে। বর্তমানে নাজমুল অটোয়ায় বসবাস করছেন। কানাডায় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর কানাডা পোস্টে চাকরি করে অবসর নিয়েছেন।
নাজমুল ছাড়াও হাইকোর্ট থেকে খুনের অভিযোগে অব্যাহতিপ্রাপ্ত অপর দুই সামরিক কর্মকর্তা যথাক্রমে মেজর (অব.) আহমেদ শরাফুল হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) কিসমত হাশেম রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে কানাডায় নাগরিকত্ব পেয়েছেন। শেষোক্ত দুজন মন্ট্রিয়ল ও অটোয়ায় আছেন। শরাফুল নামধাম পরিবর্তন করে অন্য প্রদেশে লোকচক্ষুর আড়ালে বসবাস করছেন।
কানাডা একটি শান্তিপূর্ণ দেশ। আর সেই শান্তির ছত্রছায়ায় বাংলাদেশের একাত্তরের খুনি, পঁচাত্তরের খুনি, জেলহত্যার খুনিরা আশ্রয় নিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে কারো কারো কানাডার মাটিতে মৃত্যু ঘটেছে। যেমন :জেলহত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) কিসমত হাশেম ক্যানসারে ভুগে গত ২৫ মার্চ ২০১৫ সালে মন্ট্রিয়লে আর যুদ্ধাপরাধী মিয়া আব্বাস উদ্দিন ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে অটোয়ায় মারা গেছেন।
নূরকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক ধূম্রজাল
১৯৯৬ সালের ৫ জুলাই থেকে অদ্যাবধি—দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে লে. কর্নেল নূর চৌধুরী (Atp # 346, 2 Valhalla inn Road, Etobicoke) টরন্টোতে বাস করছেন। তারপরও নূরকে নিয়ে নানা ধরনের বিতর্কিত বক্তব্য, ভিন্নমত, ধূম্রজাল, গুজব তৈরি হয়। (দৈনিক আমাদের সময়, ৮ ডিসেম্বর ২০০৯, ঢাকা)
লন্ডনস্থ একটি সংবাদ সংস্থা দাবি করছে, তিনি (নূর চোধুরী) ‘এখলাসুর রহমান’ নাম ধারণ করে ২৬-২৭ বছর ধরে পূর্ব লন্ডনের ডকল্যান্ডের ওয়েস্টফেরিতে ভাতিজির সঙ্গে বসবাস করছেন, ব্রিকলেনে ‘হাজি’ হিসেবে জুমার নামাজ পড়েছেন, স্থানীয় মাঠে সামরিক কায়দায় ব্যায়াম করেছেন, কাপড়ের দোকানে কর্মরত ছিলেন ইত্যাদি। তাতে মনে হয়, নূর চৌধুরী যুক্তরাজ্যে। (১৬ আগস্ট ২০১০, ইউকেবিডি নিউজ, লন্ডন)।
এখানে দেখা যাচ্ছে যে, নূরের রাজনৈতিক আবেদন চার-চারবার প্রত্যাখ্যানের পর ২০০৭ সালের ২৩ মে রিফিউজি বোর্ডের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাকে কানাডা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দিয়ে অটোয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে চিঠি প্রদান করে। কিন্তু তত্কালীন হাই কমিশনার এ ব্যাপারে সাড়া না দেওয়ায় নূর অদ্যাবধি কানাডাতেই রয়ে গেছেন। তার মৃত্যুদণ্ডাদেশের পর তার থাকার বিষয়টি আরো পাকাপোক্ত হয়। কারণ, কানাডা মৃত্যুদণ্ড আইনের বিপক্ষে। ফলে এই জটিলতার জালে এখনো নূর কানাডার জামাই আদর পাচ্ছেন! তবে তাকে ফেরত নেওয়ার এখনো অনেক সহজ ও একাধিক আইনি পথ আছে। যেমন :
১. দুই দেশের মধ্যে বিনিময় চুক্তি
২. অভিযুক্ত যে দেশ থেকে ঢুকেছে, সেই দেশে
ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া
৩. বাংলাদেশে আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ড রহিত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া।
এ পর্যন্ত নূরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে ইয়াকুব আলী একটি, কামরুল হাসান একটি এবং সর্বশেষ মিজানুর রহমান আরেকটি মামলা করেছেন; অর্থাত্ তিন-তিনটি মামলা। কোনো মামলার সঙ্গে কোনো মামলার মিল নেই, সমন্বয় নেই। প্রথমটি ফেরত নেওয়ার জন্য, দ্বিতীয়টি ল ফার্মের মাধ্যমে লবিস্ট নিয়োগ, তৃতীয়টি নূর কোন স্ট্যাটাসে এখন কীভাবে আছে, তা জানার জন্য আইনি লড়াই!
তাছাড়া মন্ত্রী পিয়ারে ট্রুডো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছেন। তিনি বাংলাদেশে সফরে এসেছেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানও তাঁর আমন্ত্রণে কানাডা সফর করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু হিসেবে পিয়ারে ট্রুডোকে বাংলাদেশ সরকার সম্মাননাও দিয়েছে। এ বিষয়গুলো অবশ্যই দু দেশের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর এখন হুইল চেয়ারে বসা, হার্ট ও লিভারের অসুখে গুরুতর অসুস্থ। অনেকটা মৃত্যুর মুখোমুখি। কানাডা তাকে বাংলাদেশের কাছে ফেরত না দিলে হয়তো টরন্টোতেই ঘৃণিত খুনি নূরের জীবনের অবসান হবে এবং বাংলাদেশের এই কলঙ্কের কবর থাকবে কানাডায়!
লেখক :কবি
