বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৯, ১৯:১০

হামিদুজ্জামান খান

 

শকুনি লেকের এক কোণে পানির মধ্য থেকে উঠে এসেছে এই ভাস্কর্য। নিচে শক্ত করে পাইলিং করে তুলে আনা হয়েছে এই বেদি। পানির ওপর থেকে ১৩ ফুট উঠে এসেছে সিমেন্টের দেয়ালটি। তার ওপর বসানো হয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্যটি। ব্রোঞ্জের তৈরি অংশের উচ্চতা ৮ ফুট। সব মিলিয়ে উচ্চতা ২১ ফুট। প্রস্থে আছে ৭ ফুট। মেটালের পুরুত্ব আছে ২/৩ ইঞ্চির মতো। এই ভাস্কর্যটি দুই দিক থেকে শুধু দেখা যাবে

মাদারীপুরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য আমার একটি অন্যতম সেরা কাজ। আমি মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে অনেক ভাস্কর্য করেছি। সে হিসেবে এর আগে বঙ্গবন্ধুর ওপর একক ভাস্কর্য করা হয়ে ওঠেনি। আবার মুক্তিযুদ্ধই বঙ্গবন্ধু বা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী শকুনি লেক সংস্কার করা হচ্ছে। সংস্কারের কাজটা করছে স্থপতি ইকবাল হাবিবের প্রতিষ্ঠান ‘ভিত্তি’। সেখানে একটি বঙ্গবন্ধুর মনুমেন্ট করতে হবে। মাদারীপুর শহরের মধ্যখানে এই লেকটি প্রথম খনন করা হয় ব্রিটিশ আমলে। তার সংস্কারের কাজ শুরু করবে শতাধিক বছর পরে। ভাস্কর্যের জন্য লেকের মধ্যে জায়গা নির্বাচন করা হলো। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই দেশে অনেক কাজ হয়েছে। একটা কিছু করে দিলেই তো আর হলো না। জাতির জনকের ভাস্কর্য। অনেক ভেবে ভাস্কর্যের একটি মডেল দাঁড় করালাম। একটি পতাকার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের হাত উঁচিয়ে ভাষণের ভঙ্গি। ইকবাল হাবিব মডেল দেখেই পছন্দ করল। বলল, এটাই আমার চাই। মেয়রও পছন্দ করলেন। সাংসদ বাহাউদ্দিন নাসিম সাহেবও পছন্দ করলেন। কিন্তু সে মুহূর্তে কাজটা আর এগোল না। সবাই আসলে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে সম্মত হতে পারছিলেন না। থেমে গেল ভাস্কর্য গড়ার কাজ। ইকবাল হাবিব আশা ছাড়লেন না। হংকং থেকে বড় আকারের ভাস্কর্যটির একটি স্লাইট করে আনালেন। আবার সভা ডেকে প্রজেক্টরে সেটা দেখালেন। বড় আকারে দেখে তারা পছন্দ করলেন। আমরা তো হুবহু ভাস্কর্য দেখে অভ্যস্ত। আমাদের চিরচেনা দেখার বাইরে একটা ভাস্কর্য যে গড়তে দেওয়া হলো, এটা বড় একটা পাওয়া।

শকুনি লেকের এক কোণে পানির মধ্য থেকে উঠে এসেছে এই ভাস্কর্য। নিচে শক্ত করে পাইলিং করে তুলে আনা হয়েছে এই বেদি। পানির ওপর থেকে ১৩ ফুট উঠে এসেছে সিমেন্টের দেয়ালটি। তার ওপর বসানো হয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্যটি। ব্রোঞ্জের তৈরি অংশের উচ্চতা ৮ ফুট। সব মিলিয়ে উচ্চতা ২১ ফুট। প্রস্থে আছে ৭ ফুট। মেটালের পুরুত্ব আছে ২/৩ ইঞ্চির মতো। এই ভাস্কর্যটি দুই দিক থেকে শুধু দেখা যাবে। দুই পাশ থেকে ভাস্কর্যের নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে ফুটে ওঠে বঙ্গবন্ধুর অবয়ব। বঙ্গবন্ধু হাত ছড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এখানে বঙ্গবন্ধু অবয়ব হুবহু নয়। তারপরও সাধারণ মানুষের কমিউনিকেট করতে একটুও অসুবিধা হয় না। দেখেছি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ ভিড় করে থাকে। ভাস্কর্যের সঙ্গে ছবি তোলে। ভাস্কর্যের দিকে তাকিয়ে বঙ্গবন্ধুর নানারকম গল্প বলে। দিবারাত্রিতে আকাশের রং বদলায়। ভাস্কর্যটি দেখায়ও ভিন্নতা আসে। ভাস্কর্যটি দেখার জন্য চারপাশে করে দেওয়া হয়েছে স্পেস। এই ভাস্কর্য দেখার সময় এর চারপাশ ঘুরে দেখে প্রায় সবাই।

আমার পূর্বধারণা আছে বাইরে ভাস্কর্য গড়ার। সেই হিসেবেই এর উপকরণ নির্বাচন করা হয়েছে। এটি হাজার হাজার বছরের জন্য গড়া। সেজন্যই ব্রোঞ্জ দিয়ে গড়া। ব্রোঞ্জের কাজটুকু করতে সময় লেগেছে কয়েক বছর। সেটা আমার কাছে পড়ে ছিল অনেক বছর। সিমেন্টের পিলারের ওপর বসাতে চার মাস সময় লেগেছে। অনেক ভালোবাসা দিয়ে গড়া আমার এই বঙ্গবন্ধু। মাদারীপুরের নেতৃবৃন্দের কছে আমি কৃতজ্ঞ এই ভাস্কর্য গ্রহণ করার জন্য। আরো কৃতজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিবের কাছে। তিনি জোড়ালো পদক্ষেপ না নিলে এই সুন্দর বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য আমি উপস্থাপন করতেই পারতাম না। তারপরও সেভাবে উদ্বোধন হয়নি। ২০১৬ সালে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মাদারীপুরের মানুষ এই ভাস্কর্যটি ভালোবেসে গ্রহণ করেছে। কিন্তু ভিন্ন ধারার এই বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য রয়েছে দেশের মানুষের চোখের আড়ালে।

 

লেখক : চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর