রংপুরের পীরগঞ্জে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (টিআর, কাবিখা ও কাবিটা) বরাদ্দ বণ্টনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। রংপুর-৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিন তার নিজের ভাগনে ও ভগ্নিপতিসহ নিকটাত্মীয়দের এসব প্রকল্পের সভাপতি করেছেন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ায় সরকারি বরাদ্দ বণ্টনের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে টেস্ট রিলিফ (টিআর) খাতে ৩০ লাখ টাকা, কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) খাতে ২৫ লাখ টাকা এবং কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচিতে ৪০ টন খাদ্যশস্য পেয়েছেন সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন। তার নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে এই বরাদ্দগুলো মোট ৩০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে টিআরের ১৪টি, কাবিটার ১১টি এবং কাবিখার ৫টি প্রকল্প রয়েছে।
এই প্রকল্পগুলোর মধ্যেই পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের তুলারামপুর গ্রামে দুটি কাবিখা প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমপির এক নিকটাত্মীয়ের পরিবারকে। এর মধ্যে একটি হলো ইয়াকুব আলীর বাড়ির সামনের ওয়াক্তিয়া নামাজঘরের উন্নয়ন ও মাঠে মাটি ভরাটকরণ প্রকল্প, যেখানে ১০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে ইয়াকুব আলীকে, যিনি সম্পর্কে সংসদ সদস্যের চাচাতো বোনের স্বামী। অন্যদিকে, ইয়াকুবের বাড়ি থেকে মুশফিকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সলিংকরণ এবং পুকুরপাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণসহ মাটি ভরাটের জন্য নেওয়া আরেকটি প্রকল্পে সভাপতি করা হয়েছে ইয়াকুবের ছেলে সালমান শরিফকে। অর্থাৎ, পাশাপাশি দুটি প্রকল্পের সভাপতি হয়েছেন পিতা ও পুত্র, যারা সম্পর্কে এমপির ভগ্নিপতি ও ভাগনে।
বরাদ্দের এই ধরন নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা চলছে। তুলারামপুর গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গ্রামের পুরোনো জামে মসজিদে নিয়মিত শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। সেই মসজিদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। অথচ সংসদ সদস্য স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের আত্মীয়দের ঠিকই প্রকল্প দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পীরগঞ্জ পৌর জামায়াতের এক নেতাও এই স্বজনপ্রীতির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ভাগনে ও ভগ্নিপতির নামে প্রকল্প বরাদ্দের বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য এবং এটি লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই, দ্রুতই তা সবার সামনে উন্মোচিত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প সভাপতি ও এমপির ভাগনে সালমান শরিফ আত্মীয়তার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানান, সংসদ সদস্য সম্পর্কে তার মামা হন এবং কাজে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিতেই তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কোনো অর্থ আত্মসাৎ করা হবে না দাবি করে তিনি বলেন, কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে দল থেকেই আগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কারণ তার বাবা জামায়াতের একজন ওয়ার্ড সেক্রেটারি। অন্যদিকে, এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য নুরুল আমিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সংসদে থাকার কারণ দেখিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও তদারকির বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজ জানান, ওই দুই প্রকল্পের বিপরীতে যথাক্রমে ১০ টন ও ৮ টন গম বরাদ্দ রয়েছে, যার অর্ধেক ইতিমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। তবে কাজের মান যাচাই করেই বাকি বরাদ্দ দেওয়া হবে, এক্ষেত্রে সভাপতি এমপির আত্মীয় কি না, তা বিবেচ্য নয়।
একই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান আশ্বস্ত করে বলেন, কাজ না করে সরকারি বরাদ্দ বা খাদ্যশস্য আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই। সরেজমিনে কাজ বুঝে নেওয়ার পরই বরাদ্দের অর্থ বা শস্য চূড়ান্তভাবে ছাড় করা হবে।

