জার্সি বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করানো গোলকিপারই জার্মান বধের নায়ক

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০০:৫৯

বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে প্যারাগুয়েকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছেন দলটির গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার এই ২৬ বছর বয়সী খেলোয়াড়ের বীরত্বে বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো নকআউট পর্বের বাধা পেরিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। অথচ মাত্র চার বছর আগেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে নিজের খেলার সরঞ্জাম বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়েছিল অখ্যাত এই ফুটবলারকে।

চলতি বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে খেলছেন গিল। টুর্নামেন্টের শুরুতে যৌথ আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হেরে অভিযান শুরু করলেও এরপর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। পরবর্তী তিন ম্যাচে (জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়সহ) মাত্র একটি গোল হজম করেছেন। এসব ম্যাচে প্রতিপক্ষের নেওয়া অন-টার্গেট ১৭টি শটের মধ্যে ১৬টিই অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দিয়েছেন এই গোলরক্ষক। সর্বশেষ জার্মানির বিপক্ষে শুটআউটে দুটি দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচসেরার পুরস্কারও নিজের করে নেন তিনি।

ম্যাচ শেষে ঐতিহাসিক এই অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ পাওয়া পুরস্কারটি নিজের পরিবার ও অসুস্থ ভাগনে আলেকজান্ডারকে উৎসর্গ করেন গিল। দেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভাগনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আলেকজান্ডার, এই ট্রফিটা তোমার জন্য। আশা করি তুমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে। দূর থেকে তোমার গডফাদার সবসময় তোমাকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে।’

গিলের আজকের এই তারকাখ্যাতির পেছনের গল্পটা চরম সংগ্রামের। ২০২২ সালের শেষের দিকে নির্ধারিত সময়ের আগেই তার ছেলে লাউতারোর জন্ম হয়। শারীরিক জটিলতার কারণে ওই বছরের ডিসেম্বরে তার স্ত্রীর জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয় এবং নবজাতককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। গত বছর গিলের স্ত্রী মেলিসা এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানিয়েছিলেন, পরিবারের খরচ ও সন্তানের চিকিৎসার জন্য গিল নিজের খেলার সরঞ্জাম, পোশাক, জুতো এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের জার্সিটিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

প্যারাগুয়ের ‘ক্লাব ১৩ দে জুনিও’ এবং ‘সিএস সান লোরেঞ্জো’র যুব দলে গিলের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু। ২০১৯ সালে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে ডাক পেলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তার সিনিয়র পর্যায়ে ক্লাব ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র তিনটি। চরম দুর্দিনে আর্জেন্টিনার শীর্ষ স্তরের ক্লাব ‘সান লোরেঞ্জো’ তাকে ধারে দলে ভেড়ায়। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ দলে খেলার পর ২০২৫ সালে মূল একাদশে নিয়মিত সুযোগ পান তিনি।

ক্লাবের হয়ে এমন পারফরম্যান্স দ্রুতই জাতীয় দলের কোচ গুস্তাভো আলফারোর নজরে আসে। গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পেরুর বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর আরও পাঁচটি প্রীতি ম্যাচে মাঠে নেমে জাতীয় দলের মূল গোলরক্ষক হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেন গিল। যার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা গেল বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে জার্মানির বিপক্ষে এই রূপকথার জয়ে।

ইত্তেফাক/এনএন