এক যুগে ঝরে পড়েছে অর্ধেক শিক্ষার্থী

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০

নানা কারণে শিক্ষার বিভিন্ন স্তর থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত এক যুগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার ৩টি কারণ সামনে এনেছেন শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, বাল্যবিবাহের কারণে মেয়ে এবং শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ায় ছেলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ। আর্থিক অনটনে অনেক পরিবার খরচ মেটাতে না পেরে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে কাজে (শিশুশ্রম) যুক্ত করেছে। করোনা মহামারির কারণে দেশে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে টানা ৫৪৩ দিন স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এই সময়ে জুম বা গুগল মিটের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পাঠদান অব্যাহত রাখা হয়। তবে ডিভাইস ও ইন্টারনেটের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী ছিল ক্লাসের বাইরে। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ঐ সময় অনেক শিক্ষার্থী আর ক্লাসে ফিরে আসেনি।

জানা গেছে, এক যুগের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে। তবে গত দুই বছরে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যার প্রেক্ষিতে চলমান ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে ৮ লাখ, একাদশ-দ্বাদশে ২৬ লাখ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১১ লাখ আসন ফাঁকা রয়েছে। দুই বছর আগে এসএসসি পাশ করেও এবার এইচএসসি পরীক্ষায় নেই ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত নভেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। বাকি ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। যদিও শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা ও ধরে রাখার জন্য সরকার প্রতি বছর উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে বই, খাবার দেওয়াসহ অন্যান্য খাতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এরপরও বিভিন্ন পর্যায়ে এত অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে—এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

এসএসসি পাশ করেও একাদশে ভর্তি হয়নি ১ লাখ ৮০ হাজার: আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশ করেছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছিল ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন। অর্থাত্ এসএসসি পাশ করেও ১ লাখ ৮০ হাজার ২২১ জন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়নি। আর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন করেও পরীক্ষায় অংশ নিতে চূড়ান্ত ফরম পূরণ করেনি ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী। গত বৃহস্পতিবার এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন ছাত্র-ছাত্রী। সব মিলিয়ে গত দুই বছরে ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৪ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। অর্থাত্ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

সংসার সামলিয়ে প্রভাতির পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই: নূর ইয়াসমিন হিরা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। তিন বছর আগে একমাত্র মেয়ে প্রভাতির বিয়ে দেন তিনি। প্রভাতির বয়স তখন ১৯ বছর। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। বিয়ের পর প্রভাতির আর পড়াশোনা হয়নি। এখন এক সন্তানের মা তিনি। নূর ইয়াসমিন হিরা বলেন, তিনি চাইতেন মেয়ে পড়াশোনা করুক। জামাতারও সেই ইচ্ছা ছিল। দুজনে মিলে প্রভাতিকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু সংসার সামলিয়ে প্রভাতির পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই।

পরিবারের হাল ধরতে কলেজে ভর্তি হতে পারেনি রফিকুল :আর্থিক টানাপোড়েনের জন্য অনেক শিক্ষার্থীকে ধরতে হচ্ছে পরিবারের হাল। যার কারণে লেখাপড়ার ইতি টানতে হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীর। তাদেরই একজন মো. রফিকুল ইসলাম। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। তিন ভাইবোন আর মাকে নিয়ে তার বেড়ে ওঠা। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মা পড়াশোনার খরচ চালান। বয়সের কারণে তিনি (মা) অসুস্থ হওয়ার পর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশমে ওঠা পর্যন্ত টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন রফিকুল। কিন্তু একাদশ পর্যায়ের খরচ, সঙ্গে পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়ায় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি। রফিকুল বলেন, ইচ্ছে ছিল যেমন করেই হোক অন্তত স্নাতকটা শেষ করব। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি।

৪২ শতাংশ পড়াশোনা বন্ধ করেছেন বিয়ে করার কারণে: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আর্থসামাজিক ও জনমিতি জরিপ-২০২৩-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে ছয়টি মূল কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো বিয়ে করা, কর্মে যুক্ত হয়ে যাওয়া, আর্থিক অসচ্ছলতা, পড়ালেখায় অনীহা, কাজ খোঁজা, করোনা মহামারির পর আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না ফেরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪২ শতাংশ পড়াশোনা বন্ধ করেছেন বিয়ে করার কারণে। ঝরে পড়া মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ হার ৭১ শতাংশ। আর ছেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ শতাংশ।

কাজে যোগ দেওয়ার কারণে ২০ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে পড়ালেখা ছেড়েছে :প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিয়ে ছাড়া বাকি পাঁচ কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়ার হার মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের অনেক বেশি। যেমন, কাজে যোগ দেওয়ার কারণে ২০ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। ছেলেদের মধ্যে এ হার ৪১ শতাংশ হলেও মেয়েদের মাত্র ৫ শতাংশ।

অতিমাত্রার শিক্ষাব্যয়কে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা :শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ঝরে পড়ার প্রকৃত তথ্য নিরূপণ করা জরুরি। সেজন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এদিকে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ‘অতিমাত্রার শিক্ষাব্যয়’কে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলেন, সমাজের অতিদরিদ্র ব্যক্তিটিও চান তার সন্তান লেখাপড়া করুক। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে দেশে যে ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, নোট-গাইড আর প্রাইভেট-কোচিংয়ের যে দৌরাত্ম্য চলছে, কম আয়ের পরিবারগুলো এ ধাক্কা সামলাতে পারছে না বলেই ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক জন অধ্যাপক বলেন, বিয়ের কারণে যে ৪২ শতাংশ ছেলেমেয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার কথা বলা হয়েছে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত হওয়ার হারও কমে যায়। তারা ভালো পেশা বা কাজে যুক্ত হতে পারে না। ফলে আয় কম হয়। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদান কমে যায়।

কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কত আসন ফাঁকা: বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৮ হাজার ৯৬৮টি মাধ্যমিক স্কুলে মোট ৮১ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এদিকে জরিপে দেখা গেছে, সব বিভাগেই প্রাথমিক থেকে নিম্ন মাধ্যমিক এবং তারপর উচ্চ মাধ্যমিকে যেতে যেতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষ করার হার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ, নিম্ন মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হারও একইভাবে কমছে। প্রাথমিক স্তরে উপস্থিতি ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ, কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিকে কমে ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে মাত্র ৫০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে গত দেড় দশক ধরে প্রতি বছরই আসন ফাঁকা থাকার ঘটনা ঘটছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে কেউ কর্ণপাত করছেন না। বর্তমানে দেশের পাবলিক-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল-ডেন্টাল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ মিলিয়ে অনার্স ও সমমান পর্যায়ে ১৮ লাখ ৭ হাজার ৫৭৬ জন শিক্ষার্থীর ভর্তি হওয়ার আসন রয়েছে। তবে ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন শিক্ষার্থী। উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী আবার ভর্তি হয়নি। যার ফলে উচ্চ শিক্ষায় ১১ লাখ আসন ফাঁকা রয়েছে।  বিভিন্ন কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ২৬ লাখ ৫৮ হাজার বেশি আসন রয়েছে। ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশ করে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। অর্থাত্ ১৩ লাখের বেশি আসন ফাঁকা রয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণীতেও সমসংখ্যক আসন ফাঁকা রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর উদ্বেগকারণ অনুসন্ধানে বোর্ড: বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি রেজিস্ট্রেশন করেও বিপুল সংখ্যাক শিক্ষার্থী এইচএসসিতে না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে, এর কারণ খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা কেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পার হওয়ার আগেই শিক্ষাজীবনের ইতি টানছে, তা খতিয়ে দেখতে গবেষণামূলক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার।

ইত্তেফাক/এএম