চামড়া ফেলে দেওয়া হলো রাস্তায়, নদীতে

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৯, ২১:৩৯

ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি দিয়ে কোরবানিদাতারা চামড়া নিয়ে নজিরবিহীন এক সংকটের মুখে পড়েন। চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে দেখেন ক্রেতা নেই। অনেকস্থানে ক্রেতা থাকলেও চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে। এ অবস্থায় মাদ্রাসা ও এতিমখানায় চামড়া দান করে দেন কোরবানিদাতারা। কিন্তু সেই চামড়াও বিক্রি করতে পারেননি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। ক্ষোভে-দু:খে অনেকস্থানে চামড়া রাস্তা ও নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামে ফেলে দেওয়া লক্ষাধিক পিস চামড়া অপসারণ করেছে সিটি করপোরেশন। অনেক জেলায় চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়। ধর্মীয়মতে, চামড়া বিক্রির অর্থ দরিদ্র মানুষদের দান করতে হয়। এবার কোরবানিদাতারা সেই সুযোগ পাননি। যার কারণে কোরবানিদাতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। চামড়া ক্রয় করতে না পেরে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন  স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রামে লাখ পিস পচা চামড়া অপসারণ

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তা থেকে কয়েকশ টন কোরবানির পশুর পচা চামড়া অপসারণ করা হয়েছে। আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অবিক্রিত এসব চামড়া রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলেন। তারা এ কাজটি শুরু করেন মূলত ঈদের দিন রাত থেকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা প্রথমদিকে কোরবানির অন্যান্য বর্জ্য অপসারণ করলেও চামড়া সরানোর কাজ করেনি। সারারাত রাস্তায় পড়ে থাকার কারণে চামড়ায় পচন ধরে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে চামড়া অপসারণের কাজ শুরু করে চসিক। চামড়া ফেলে রাখার বিষয়টিকে ‘অভূতপূর্ব’ উল্লেখ করে চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রধান শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী বলেন, রাস্তায় চামড়া পচেগলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। আমরা এক লক্ষাধিক গরু, ছাগলের চামড়া অপসারণ করেছি। প্রথমদিকে বড় চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও পরে দাম পড়তে পড়তে বড় চামড়ার দাম ৫০ টাকা পর্যন্ত নেমে আসে। 

বরিশালে মাদ্রাসাগুলো চামড়া পেয়েও বিপাকে

বরিশাল অফিস জানায়, বরিশালে এবার চামড়ার দাম এতই কমে গেছে যে, লবণ ও শ্রমিক মজুরির টাকাও উঠেনি। ফলে পচে যাওয়া চামড়া যে যার মতো ফেলে দিয়েছে। এবার পাইকাররা চামড়া কিনেতে অনীহা প্রকাশ করায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষসহ মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করেনি। ফলে মানুষ বিনামূল্যে মাদ্রাসায় চামড়া সরবরাহ করে। মাদ্রাসার লোকজন লবণ দিয়ে যে সামান্য চামড়া সংগ্রহ করেছে তা নিয়েও বিপাকে পড়েছে। লবণ, শ্রমিক ও যাতায়াত ভাড়ার দামও দিতে নারাজ পাইকাররা।

চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান শাহিন জানান, গুটি কয়েক ট্যানারি মালিকরাই সারাদেশের চামড়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সরকারের কাছ থেকে কোটি টাকা ঋণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের পাইকারদের কোনো টাকা দেয়া হয়নি। 

সিলেটে মাটিতে পুঁতে ফেলা হলো চামড়া

সিলেট অফিস জানায়, কাঙ্খিত মূল্য না পেয়ে চামড়া ফেলে গেছেন রাস্তায়, কেউ কেউ আবার মাটিতে পুঁতে ফেলছেন মনের ক্ষেভে। রাস্তায় ফেলে রাখা চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়ে সিলেট সিটি করপোরেশন। পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ায় সেগুলো ঈদের রাতেই অপসারণ করা হয়েছে। সিলেট নগরীর বিভিন্নস্থানে ফেলে রাখা প্রায় ১০ টন চামড়া নিয়ে ফেলা হয়েছে দক্ষিণ সুরমার পারাইরচকে ময়লার ভাগাড়ে। সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ভালো দাম না পাওয়ায় চামড়া বিক্রেতারা রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান।    

জগন্নাথপুরে প্রায় ৯ শত চামড়া পুঁতে ফেলা হয়

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ৮৪০ কোরবানির পশুর চামড়া পুঁতে ফেলা হয়। মঙ্গলবার উপজেলার সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর হোসাইনিয়া হাফিজিয়া আরাবিয়া দারুল হাদিস মাদরাসা প্রাঙ্গনে ওই সব চামড়া পুঁতে দেওয়া হয়। 

খুলনায় পানির চেয়েও স্বস্তায় পশুর চামড়া

খুলনা অফিস জানায়, খুলনায় পানির চেয়েও সস্তায় বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। এতে চামড়া সংগ্রহের জন্য পরিশ্রম এবং বহনের জন্য রিকশা ভাড়াও ওঠেনি। শেখপাড়া চামড়া পট্টির ইয়াসিন লেদারের মালিক মো. আবু জাফর বলেন, তার এবার চামড়া কেনারই কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু যাকে যে দাম বলছি তারা টাকা নিয়ে চামড়া  রেখে চলে যাচ্ছে। 

বগুড়ায় চামড়া ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া জানান, বগুড়ায় মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের (ফড়িয়া) এবার মাথায় হাত পড়েছে। বগুড়া সদরের জিগাতলা এলাকার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম জানান, গ্রাম ঘুরে ছাগল ও ভেড়ার চামড়া কেনেন ১০০ পিস। কিন্তু চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। গরুর চামড়া বিক্রি করেও লোকসান গুনতে হয়েছে বহু ব্যবসায়ীকে। 

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, যারা পশু কোরবানি দিয়েছেন, তারা যেমন চামড়ার দাম পাননি, তেমনি মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন। অন্যদিকে দাম কম হওয়ায় এবার বিপুল পরিমাণ চামড়া সীমান্ত গলিয়ে ভারতে পাচারের আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি সম্ভবত এই প্রথম। রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ বলেন, পুঁজি সংকটে এ অঞ্চলের ১২৭ জন ব্যবসায়ী থাকলেও বর্তমানে ব্যবসা করছেন মাত্র ৮/১০ জন।

রংপুরে চামড়ার বাজারে ধসে দায়ী লোকাল সিন্ডিকেট                     

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, ঈদের আগের বাজারের চেয়ে চার ভাগের এক ভাগও দাম নেই চামড়ার। এবার চামড়ার দাম না থাকায় ধস নেমেছে বাজারে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে সরকার নির্ধারিত দামের অনেক কমেও ক্রেতা নেই চামড়ার।

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, একেবারেই চামড়ার দাম নেই। চামড়া ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ টাকা অভাব রয়েছে।  

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, ভরমাধাইমুড়ি সিদ্দিকিয়া দারুল উলুম কাওমি মাদ্রার শিক্ষক মতিউর রহমান জানান, এবার চামড়ার দাম হওয়ার কারণে অনেক গ্রামে ছাগল-ভেড়ার চামড়া কেউ কিনতেও পর্যন্ত যায়নি। অনেক কুরবানিদাতা পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছে।